বিসর্জনের পর দেবী কোথায় যান?

যে দেবীকে আমরা বাইরে খুঁজছিলাম, বিসর্জনের পর তিনি আমাদের হৃদয়ে প্রতিষ্ঠিত হন। বিসর্জন তাই কোনো শেষ নয়, এটি হলো এক নতুন সূচনার মুখবন্ধ।
শারদীয় দুর্গোৎসবের শেষ দিন বিজয়া দশমী। কয়েক দিনের উৎসব, আরাধনা ও আনন্দের পর এদিন দেবী দুর্গাকে বিদায় জানাতে হয়। মণ্ডপে মণ্ডপে শুরু হয় বিসর্জনের আয়োজন। কিন্তু এই বিদায় কেবল একটি ধর্মীয় আচার নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে জীবন-মৃত্যু, সৃষ্টি-বিলয় এবং ফিরে আসার চিরন্তন দর্শন।
যে জন্ম নিয়েছে, তার মৃত্যু অনিবার্য। ঠিক তেমনি, যাকে আবাহন বা আমন্ত্রণ জানানো হয়, তার বিসর্জনও অনিবার্য। মহাদশমীর সকালে মণ্ডপে এক নীরব কান্নার সুর বেজে ওঠে। শঙ্খধ্বনি আর সিঁদুর খেলার রাঙা আলোর মাঝেও লুকিয়ে থাকে এক পরম বিদায়ের বেদনা। বিসর্জন শব্দটির সাধারণ অর্থ চলে যাওয়া হলেও, সনাতন দর্শনে এর অর্থ অত্যন্ত গভীর। আমরা যে মৃন্ময়ী প্রতিমাকে চার দিন ধরে পূজা করলাম, তাকে জলের স্রোতে বিসর্জন দেওয়ার অর্থ হলো—সাকার রূপকে পুনরায় নিরাকার ঈশ্বরে রূপান্তরিত করা।
ভারতীয় দর্শনশাস্ত্র মনে করে, এই জগৎ পঞ্চভূত বা পাঁচটি উপাদান দিয়ে তৈরি—আকাশ, বায়ু, অগ্নি, জল ও মাটি। দেবী প্রতিমাও তৈরি হয়েছিল মাটি দিয়ে। বিসর্জনের সময় সেই মাটির প্রতিমা যখন নদীর জলে মিশে যায়, তখন আসলে প্রকৃতির উপাদান প্রকৃতিতেই ফিরে যায়। কিন্তু দেবীর যে ‘চিন্ময়ী’ বা চেতনার রূপ, তাকে বিসর্জন দেওয়া যায় না। তাকে প্রতিমার বুক থেকে টেনে এনে নিজের হৃদয়ের মণিকোঠায় স্থাপন করতে হয়।
শচীন দেব বর্মণ যখন গেয়েছিলেন, ‘বিসর্জনের ব্যথা ভোলায় আগমনের খুশিতে’, এই আগমনী পরের বছরের বাহ্যিক পূজার প্রস্তুতি নয়। এই আগমন হলো নিজের হৃদয়ের ভেতরে মায়ের চিরস্থায়ী প্রতিষ্ঠার আগমন। যে দেবীকে আমরা বাইরে খুঁজছিলাম, বিসর্জনের পর তিনি আমাদের হৃদয়ে প্রতিষ্ঠিত হন। বিসর্জন তাই কোনো শেষ নয়, এটি হলো এক নতুন সূচনার মুখবন্ধ। সাকারের অন্তরালে নিরাকারকে উপলব্ধি করার এই যে পরম দর্শন, বিজয়া দশমী আমাদের সেই শিক্ষাই দিয়ে যায়।


