৪২৬ জনে ১টি মণ্ডপ: দুর্গাপূজার বিশ্বরেকর্ড বাংলাদেশের ঘরে

ডিপি ডেস্ক
প্রকাশ: ২৩ অক্টোবর ২০২৬, ১০:০২পরিবর্তন করতে ক্লিক করুন
৪২৬ জনে ১টি মণ্ডপ: দুর্গাপূজার বিশ্বরেকর্ড বাংলাদেশের ঘরে

ছবিঃ সংগৃহীত

শেয়ার করুন:

দুই বাংলার এবারের দুর্গাপূজার পরিস্থিতি তুলনা করলে পশ্চিমবঙ্গে মণ্ডপে পদপিষ্ট হয়ে মানুষের মৃত্যু, বামপন্থীদের বইয়ের স্টল ভাঙচুর এবং খাদ্যাভ্যাসে নিরামিষ সংস্কৃতি চাপিয়ে দেওয়ার অভিযোগ সামনে এসেছে। অন্যদিকে, বাংলাদেশে দুর্গাপূজার মণ্ডপের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং নিরাপত্তা নিয়ে তুলনামূলক স্বস্তির চিত্র দেখা গেছে।

হিন্দু জনসংখ্যার অনুপাতে দুনিয়ার সবচেয়ে বেশি দুর্গাপূজার মণ্ডপ এবার বসেছে বাংলাদেশে। গড়েছে বিশ্বরেকর্ড। প্রতি ৪২৬ জন হিন্দুর জন্য ১টি মণ্ডপ। প্রতি এক লাখে ২৩৫টি। বাংলাদেশের ১৮ কোটি মানুষের ৮ শতাংশ হিন্দু ধরলে সংখ্যা দাঁড়ায় ১ কোটি ৪৪ লাখ। এবার ৩৩ হাজার ৮০০টি মন্দির ও মণ্ডপে পূজা হয়েছে। ২০২২ সালে হয়েছিল ৩২,১৬৮টিতে। ২০২৩ সালে ৩২,৪০৮টিতে। এবার মণ্ডপ বেড়েছে প্রায় দেড় হাজার। চূড়ান্ত হিসাবে এবারের সংখ্যা ৩৩,৮৫১টি। ২০২৩ সালের চূড়ান্ত হিসাব ছিল ৩২,৪৬০টি। দুই বছর আগেও মণ্ডপ ছিল ৩২ হাজারের ওপরে। অর্থাৎ রেকর্ডটা হঠাৎ আসেনি। পাশে পশ্চিমবঙ্গকে তুলনা করতে রাখলে দেখা যায় এক অন্য দৃশ্য।

বাংলাদেশে ৪২৬ জন হিন্দুর জন্য ১টি মণ্ডপ। পশ্চিমবঙ্গে ১,১১১ জনের জন্য ১টি। বাংলাদেশে প্রতি এক লাখে ২৩৫টি মণ্ডপ। পশ্চিমবঙ্গে ৮৯টি। ছুটি বাংলাদেশে ৫ দিন, সাপ্তাহিক ২ দিনসহ। পশ্চিমবঙ্গে ১২ দিন। সারা ভারতে কেন্দ্রীয় ছুটিই নেই।

পশ্চিমবঙ্গে একটি মণ্ডপের নিচে গড়ে ১,১১১ জন হিন্দু পূজা করেছেন। বাংলাদেশে সেই সংখ্যা ৪২৬। অর্থাৎ বাংলাদেশে ভিড় অনেক কম, মণ্ডপ অনেক বেশি। মোট সংখ্যায় ভারত এগিয়ে। সেখানে ৭০ হাজারের বেশি মণ্ডপ। পশ্চিমবঙ্গে সাড়ে ৬ কোটি হিন্দুর জন্য ৫৮ হাজার ৫০০টি। ভিড় বাংলাদেশের আড়াই গুণের বেশি। ছুটি বেশি পেয়েও সেখানে ১৯ জনের মৃত্যু ঠেকানো যায়নি।

দুর্গাপূজা বাঙালি হিন্দুর সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব। এবার পশ্চিমবঙ্গে সেই উৎসব হয়েছে রঙহীন। অনেক সাধারণ হিন্দু বলছেন, এমন বাজে পূজা জন্মের পর তাঁরা দেখেননি। মণ্ডপে পদপিষ্ট হয়ে ও দুর্ঘটনায় ১৯ জন মারা গেছেন। রাজ্য সরকার ও প্রশাসনের অব্যবস্থাপনার অভিযোগ উঠেছে।

সত্তর বছর ধরে বামপন্থীরা পূজায় বইয়ের স্টল দেন। এবার অন্তত ১২ থেকে ১৫টির বেশি জায়গায় স্টল ভাঙচুর ও উচ্ছেদের খবর এসেছে। যাদবপুরে এসইউসিআই ও এপিডিআরের দুটি স্টল বুলডোজারে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। সিপিএমের ৫০ বছরের পুরোনো স্টল ভাঙার চেষ্টা হয়েছে।

টালিগঞ্জ, ঢাকুরিয়া, বারাসত, ব্যারাকপুর, হাওড়া ও উত্তর ২৪ পরগনার বিজপুরেও ভাঙচুরের খবর এসেছে। কোথাও পেট্রোল ঢেলে আগুন দেওয়ার খবর আছে। একদিকে মণ্ডপে মানুষের নিরাপত্তা দিতে পারেনি প্রশাসন।অন্যদিকে বই পুড়েছে। এবারের পূজায় মাছ-মাংসের বিরুদ্ধেও প্রচার চালিয়েছে বিজেপি। পূজার ভোজে মাটন, ডাল আর লুচি বাঙালির চিরকালের রীতি। সেখানে উত্তর ভারতের নিরামিষ সংস্কৃতি চাপানোর চেষ্টা তীব্র সমালোচনায় পড়েছে। প্রশ্ন উঠেছে, ভারতে বিজেপি হিন্দুত্বের কার্ড খেলে, সেখানে বাঙালি হিন্দুর নিজের উৎসবই কেন এমন হলো?

অপরদিকে, বাংলাদেশে এবারের দুর্গাপূজা তুলনামূলক স্বস্তির মধ্য দিয়ে উদ্‌যাপিত হয়েছে। দেশে হিন্দুরা সংখ্যালঘু হলেও জনসংখ্যার অনুপাতে দুর্গাপূজার মণ্ডপের সংখ্যা বিশ্বের মধ্যে সর্বোচ্চ। পূজার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকারের নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপ প্রশংসা পেয়েছে। সরকারের কয়েকজন সংসদ সদস্যও এ সময় হিন্দু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা ও অধিকার নিয়ে কথা বলেছেন। সব মিলিয়ে দেশের হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ মোটামুটি স্বস্তিতে পূজা উদ্‌যাপন করেছেন।

বর্তমান সরকারের নেতৃত্বে রয়েছে বিএনপি। অতীতে দলটির সঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর জোট ছিল। সাম্প্রদায়িক রাজনীতির অভিযোগে সমালোচিত জামায়াতের সঙ্গে অতীতের রাজনৈতিক সম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও এবারের পূজায় বিএনপি সরকারের ভূমিকা প্রত্যাশার চেয়ে ভালো ছিল বলে মনে করছেন অনেকে। তবে দলের ভেতরে সাম্প্রদায়িক মনোভাবাপন্ন কিছু ব্যক্তি সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা করতে পারেন—এমন আশঙ্কাও রয়েছে।

তবে পূজা উদ্‌যাপনে কিছু বিতর্কও দেখা গেছে। ফেনীতে দুর্গাপূজা চলাকালে মদ্যপানের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেন জেলা প্রশাসক ও প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। সমালোচকেরা এ সিদ্ধান্তকে বেআইনি বলে মন্তব্য করেছেন। এর আগে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেও ঢাকায় পুলিশ একই ধরনের নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিল। তবে সে সময় বিষয়টি নিয়ে তেমন আলোচনা বা সমালোচনা হয়নি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এদিকে, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রশিবিরের গরু জবাইয়ের কর্মসূচি ঘিরেও প্রতিবাদ হয়েছে। সাধারণ মানুষ ও সচেতন নাগরিকদের একটি অংশ এ কর্মসূচির বিরোধিতা করেন। তাঁদের কেউ কেউ একে হিন্দুবিরোধী মনোভাব উসকে দেওয়ার প্রচেষ্টা হিসেবে দেখেছেন। তবে এ ঘটনায় জনমতের প্রতিক্রিয়ায় উসকানিমূলক রাজনীতির প্রচেষ্টা সফল হয়নি বলে মনে করছেন অনেকে।

দুই বাংলার এবারের দুর্গাপূজার পরিস্থিতি তুলনা করলে পশ্চিমবঙ্গে মণ্ডপে পদপিষ্ট হয়ে মানুষের মৃত্যু, বামপন্থীদের বইয়ের স্টল ভাঙচুর এবং খাদ্যাভ্যাসে নিরামিষ সংস্কৃতি চাপিয়ে দেওয়ার অভিযোগ সামনে এসেছে। অন্যদিকে, বাংলাদেশে দুর্গাপূজার মণ্ডপের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং নিরাপত্তা নিয়ে তুলনামূলক স্বস্তির চিত্র দেখা গেছে।

তবে হিন্দু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা ও অধিকার নিশ্চিত করার প্রশ্নটি রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ। নাগরিকদের প্রত্যাশা, দেশে হিন্দুদের ওপর কোনো ধরনের নিপীড়ন বা বৈষম্য হবে না। একই সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোকে মনে রাখতে হবে, নির্বাচনে জনগণের সমর্থন পেতে হলে তাদের কাছে জবাবদিহি করতে হবে।



শেয়ার করুন: