প্রাচীন শিলালিপি থেকে ডিজিটাল স্ক্রিনে বাংলা বর্ণমালা

দশম থেকে দ্বাদশ শতাব্দীর মধ্যবর্তী সময়ে পাল ও সেন রাজাদের আমলে বাংলা লিপির কাঠামো স্পষ্ট হতে শুরু করে। প্রত্নতাত্ত্বিকদের মতে, এই সময়েই লিপিটি তার নিজস্ব বৈশিষ্ট্য পেতে শুরু করে, যা ‘প্রোটো-বেঙ্গলি’ বা আদি-বাংলা লিপি হিসেবে পরিচিত।
বাংলা আমাদের মাতৃভাষা, আর এই ভাষার প্রাণভোমরা হলো এর বর্ণমালা। কিন্তু আজকের পরিচিত ‘অ, আ, ক, খ’ রাতারাতি এই রূপ পায়নি। হাজার বছরের বিবর্তন, পরিমার্জন এবং শৈল্পিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে বাংলা লিপি আজকের আধুনিক রূপ লাভ করেছে।
বাংলা বর্ণমালার আদি উৎস হলো প্রাচীন ভারতের ব্রাহ্মী লিপি। সম্রাট অশোকের শাসনকালে এই লিপির প্রচলন ছিল। কালক্রমে ব্রাহ্মী লিপি উত্তর ও দক্ষিণ—এই দুই ধারায় বিভক্ত হয়ে পড়ে। উত্তর ভারতীয় ধারাটি ‘গুপ্ত লিপি’ নামে পরিচিতি পায়। সপ্তম শতাব্দীর দিকে এই লিপি আরও পরিবর্তিত হয়ে ‘কুটিল লিপি’র রূপ নেয়, যা থেকে পরবর্তীকালে পূর্ব ভারতীয় লিপিগুলোর জন্ম হয়।
দশম থেকে দ্বাদশ শতাব্দীর মধ্যবর্তী সময়ে পাল ও সেন রাজাদের আমলে বাংলা লিপির কাঠামো স্পষ্ট হতে শুরু করে। প্রত্নতাত্ত্বিকদের মতে, এই সময়েই লিপিটি তার নিজস্ব বৈশিষ্ট্য পেতে শুরু করে, যা ‘প্রোটো-বেঙ্গলি’ বা আদি-বাংলা লিপি হিসেবে পরিচিত। তখন বর্ণের মাথায় ‘মাত্রা’র ব্যবহার শুরু হয় এবং অক্ষরগুলো ধীরে ধীরে বর্তমানের মতো কৌণিক ও বক্রাকার রূপ ধারণ করে।
বাংলা লিপির ইতিহাসে সবচেয়ে বড় মোড় আসে আঠারো শতকের শেষে। ১৭৭৮ সালে নাথানিয়েল ব্রাসি হ্যালহেড-এর ‘এ গ্রামার অব দ্য বেঙ্গল ল্যাঙ্গুয়েজ’ গ্রন্থটি প্রকাশের মাধ্যমে বাংলা মুদ্রণ শিল্পের সূচনা হয়। পঞ্চানন কর্মকার ও চার্লস উইলকিনস প্রথম সচল ধাতব টাইপ তৈরি করেন, যা বাংলা বর্ণমালাকে একটি নির্দিষ্ট ও সুশৃঙ্খল ছাঁচে ফেলে।
পরবর্তীতে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর বর্ণমালার সংস্কার সাধন করেন। তিনি অপ্রয়োজনীয় কিছু বর্ণ বাদ দিয়ে এবং যুক্তবর্ণের সহজীকরণ করে বাংলা লিপিকে আধুনিক ও ব্যবহারিক রূপ দেন। তাকেই বলা হয় বাংলা বর্ণমালার প্রধান সংস্কারক।
একুশ শতকে এসে বাংলা বর্ণমালা এখন কম্পিউটার এবং স্মার্টফোনের পর্দায় রাজত্ব করছে। বিজয় থেকে ইউনিকোড—প্রযুক্তির প্রতিটি ধাপে বাংলা লিপি নিজেকে খাপ খাইয়ে নিয়েছে। আজ বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষ এই লিপিতে মনের ভাব প্রকাশ করছে।
হাজার বছরের এই বিবর্তন কেবল অক্ষরের পরিবর্তন নয়, বরং এটি বাঙালি জাতির আত্মপরিচয় ও সৃজনশীলতার এক জীবন্ত ইতিহাস।



