সীতাকুণ্ডের জাহাজ ভাঙা শিল্প: শ্রমিকের রক্তে ভেজা লোহার পাহাড়


সীতাকুণ্ড, ভাটিয়ারি ও কুমিরার উপকূলে গড়ে ওঠা জাহাজ ভাঙা শিল্প বাংলাদেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কিন্তু লোহার বিশাল কাঠামোর আড়ালে কাজ করা শ্রমিকদের জন্য প্রতিদিনের কর্মপরিবেশ কতটা নিরাপদ? দুর্ঘটনার ঝুঁকি, দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, স্বাস্থ্যঝুঁকি, নিরাপত্তা সরঞ্জামের ঘাটতি এবং সামাজিক সুরক্ষার অভাব—এই শিল্পের মানবিক মূল্য নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।
বাংলাদেশের চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড, ভাটিয়ারি ও কুমিরা উপকূলজুড়ে যে জাহাজ ভাঙা শিল্প গড়ে উঠেছে, তা দেশের ইস্পাত খাতের প্রাণশক্তি। কিন্তু এই লোহার পাহাড়ের আড়ালে প্রতিদিন যে মানবিক বিপর্যয় ঘটে, তা জাতীয় বিবেককে প্রতিনিয়ত প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়। সরাসরি ৩৫ থেকে ৪০ হাজার শ্রমিক এবং পরোক্ষভাবে দেড় থেকে দুই লাখ মানুষ এই শিল্পের ওপর নির্ভরশীল। অথচ তাদের কর্মপরিবেশ, নিরাপত্তা ও মর্যাদা আজও নির্মমভাবে উপেক্ষিত।
প্রত্যক্ষ শ্রমিকদের কথা উঠলে প্রথমেই আসে অমানবিক কর্মপরিবেশের চিত্র। সীতাকুণ্ডের ইয়ার্ডগুলোতে অধিকাংশ শ্রমিক কোনো নিয়োগপত্র বা পরিচয়পত্র ছাড়াই কাজ করেন। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা শ্রম, তার মধ্যে বিশ্রামের কোনো নিশ্চয়তা নেই। জাহাজ কাটার সময় উড়ে আসা লোহার টুকরো, বিষাক্ত গ্যাস, অ্যাসবেস্টস, সীসা ও পারদের ধোঁয়ায় ভরা বাতাস প্রতিনিয়ত তাদের ফুসফুস ও ত্বকের জন্য স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করে। অনেক ইয়ার্ডে শ্রমিকদের জন্য বিশুদ্ধ খাবার পানি, স্যানিটেশন বা ছায়ার ব্যবস্থাও পর্যাপ্ত নয়। প্রচণ্ড রোদে জাহাজের গরম লোহার গায়ে লেগে কাজ করতে করতে শরীর পুড়ে যায়, তবু কাজ থামে না।
নিরাপত্তাব্যবস্থা এ শিল্পের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা। হেলমেট, নিরাপত্তাবুট, গ্লাভস, গগলস, নিরাপত্তাবেল্ট বা অগ্নিনির্বাপক পোশাক—এসব অধিকাংশ শ্রমিকের কাছে বিলাসিতা। বহু শ্রমিক খালি পায়ে বা সাধারণ স্যান্ডেল পরে ধারালো লোহার টুকরার ওপর দিয়ে হাঁটেন। জাহাজ কাটার আগে গ্যাসমুক্ত সনদ নেওয়ার বিধান থাকলেও তা মানা হয় না। ফলে গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণ, আগুন ধরা, ভারী পাত চাপা পড়া—এসব দুর্ঘটনা প্রতিনিয়ত ঘটে। সামান্য অসাবধানতায় প্রাণ চলে যায়। অথচ ইয়ার্ডে প্রাথমিক চিকিৎসাকেন্দ্র, অ্যাম্বুলেন্স বা ফায়ার সার্ভিসের ব্যবস্থা নামমাত্র। আহত শ্রমিককে বহু দূরের হাসপাতালে নিতে নিতে মৃত্যু নেমে আসে।
মজুরির হিসাবও হৃদয়বিদারক। একজন সাধারণ শ্রমিক দৈনিক ৪০০ থেকে ৮০০ টাকা আয় করেন, দক্ষ কাটার শ্রমিক পান ৯০০ থেকে ১,২০০ টাকার মতো। জীবনহানির ঝুঁকি ও শারীরিক পরিশ্রমের তুলনায় এই অর্থ অত্যন্ত নগণ্য। ওভারটাইম, উৎসব বোনাস, চিকিৎসা ভাতা, ভবিষ্যৎ তহবিল—এসব প্রায় নেই। জাহাজ না এলে কাজ বন্ধ, তখন আয়ও বন্ধ। কোনো প্রাতিষ্ঠানিক জীবনবিমা বা স্বাস্থ্যবিমা নেই। দুর্ঘটনায় মৃত্যু হলে মালিকপক্ষ ৫০ হাজার থেকে ২ লাখ টাকার মতো এককালীন অর্থ দিয়ে দায় শেষ করার চেষ্টা করে, যা আইনসম্মত ক্ষতিপূরণের তুলনায় অতি সামান্য। পঙ্গু হয়ে যাওয়া শ্রমিকের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের দায়িত্ব কেউ নেয় না। পরিবারগুলো নিঃস্ব হয়ে পড়ে, অথচ সেই লোহাই গড়ে তোলে দেশের অট্টালিকা।
পরোক্ষ শ্রমিকদের অবস্থাও কম করুণ নয়। স্ক্র্যাপ পরিবহন, রি-রোলিং মিল, দোকানপাট, ঠিকাদারি—এসব খাতে যুক্ত দেড় থেকে দুই লাখ মানুষও এই অনিশ্চয়তার ভেতর দিন কাটান। প্রত্যক্ষ শ্রমিকদের মতো তাদেরও নেই নিরাপত্তা, ন্যায্য মজুরি বা সামাজিক সুরক্ষা। ইয়ার্ড মালিকদের লাভের অঙ্ক বাড়ে, অথচ শ্রমিকের রক্ত-ঘাম শুকিয়ে যায় সমুদ্রের নোনা বাতাসে।
এই নির্মমতা বিবেককে নাড়া দেওয়ার মতো। দেশের অর্থনীতিতে জাহাজ ভাঙা শিল্প যতটা গুরুত্বপূর্ণ, তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ মানুষের জীবন ও মর্যাদা। শ্রম আইন, ২০০৬, শিপ ব্রেকিং অ্যান্ড রিসাইক্লিং রুলস, ২০১১ এবং আন্তর্জাতিক হংকং কনভেনশনের কঠোর বাস্তবায়ন ছাড়া এই শিল্পে মানবিকতা ফেরানো সম্ভব নয়। প্রতিটি শ্রমিকের জন্য বাধ্যতামূলক জীবনবিমা, স্বাস্থ্যবিমা, নিরাপত্তা সরঞ্জাম এবং ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করাই হোক আজকের অঙ্গীকার। নইলে লোহার পাহাড়ের আড়ালে আরও রক্ত ঝরবে, আরও পরিবার পথে বসবে—আর আমরা শুধু তাকিয়ে থাকব।



