মধ্যবিত্তের শেষ ভরসা সঞ্চয়পত্রের ওপর কোপ

মধ্যবিত্ত ও নির্দিষ্ট আয়ের মানুষেরা এখন কীভাবে জীবন চালাবেন? অন্যদিকে, সঞ্চয়পত্রে সাধারণ মানুষকে বিনিয়োগের সুযোগ দিয়ে মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের যে একটি পুরোনো কৌশল ছিল, তা কাদের পরামর্শে সরকার বাদ দিল— সেটাও এখন বড় বিস্ময়ের কারণ।
সারা জীবন চাকরি শেষে পেনশনের টাকাটা অনেক বয়স্ক মানুষ জাতীয় সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ করেন। সঞ্চয়পত্র থেকে প্রতি মাসে পাওয়া মুনাফা দিয়েই চলে অনেকের সংসার, চিকিৎসা ও জীবনযাপন। একসময় বিদায়ী আওয়ামী লীগ সরকার আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) কঠিন শর্ত মেনে সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ সীমিত করেছিল এবং এতে কড়াকড়ি আরোপ করেছিল। নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পরও আইএমএফ-এর শর্ত মেনে সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ কমানোর এই ধারা অব্যাহত আছে।
এর ফলে প্রশ্ন উঠেছে— মধ্যবিত্ত ও নির্দিষ্ট আয়ের মানুষেরা এখন কীভাবে জীবন চালাবেন? অন্যদিকে, সঞ্চয়পত্রে সাধারণ মানুষকে বিনিয়োগের সুযোগ দিয়ে মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের যে একটি পুরোনো কৌশল ছিল, তা কাদের পরামর্শে সরকার বাদ দিল— সেটাও এখন বড় বিস্ময়ের কারণ।
আইএমএফ-এর ৪ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলারের ঋণ চুক্তির অন্যতম প্রধান শর্তই ছিল, সঞ্চয়পত্র থেকে সরকারের ঋণ নেওয়া ও সুদের হার কমাতে হবে। বিদায়ী আওয়ামী লীগ সরকার শেষের দিকে এসে এই শর্ত মেনেই সঞ্চয়পত্রে সুদের হার কমিয়ে দেয় এবং এটি কেনার নিয়মে কড়াকড়ি আরোপ করে। এর ফলে সঞ্চয়পত্র বিক্রি প্রায় ৮৭ শতাংশ কমে যায়। আইএমএফ-এর ‘সিলেক্টেড ইস্যুজ রিপোর্ট’-এ বলা হয়েছিল, সরকার সঞ্চয়পত্র থেকে মাত্রাতিরিক্ত ঋণ নিলে দেশের আর্থিক খাতে বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়। উচ্চ সুদে ঋণ নেওয়ার ফলে সরকারের ‘ইন্টারেস্ট পেমেন্ট’ বা সুদ পরিশোধের খরচ মারাত্মকভাবে বেড়ে যায়। এই কারণেই আইএমএফ সরকারকে সঞ্চয়পত্রের বিক্রি কমিয়ে ব্যাংক ও বৈদেশিক ঋণের ওপর নির্ভরতা বাড়ানোর শর্ত দিয়েছিল। সরকার সেই শর্ত মেনে লাগাম ঠিকই টেনেছে, কিন্তু সাধারণ মানুষের জন্য বিকল্প কোনো ‘বন্ড মার্কেট’ বা বিনিয়োগের জায়গা তৈরি করেনি।
মানুষ কেন শেয়ার বাজারে বিনিয়োগ করে না, তার একটি বড় ইতিহাস আছে। ১৯৯৬ ও ২০১০ সালের শেয়ার বাজার কেলেঙ্কারির পর সাধারণ মানুষের মনে এই বাজারের প্রতি গভীর অনাস্থা তৈরি হয়। বাজারকে ঠিকমতো গড়ে তোলার ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব ছিল সবসময়ই। আসলে একটি স্বচ্ছ ও শক্তিশালী শেয়ার বাজার বা বন্ড মার্কেট তৈরি হলে দুর্নীতি আড়াল করা কঠিন হয়ে পড়ত।
অন্যদিকে বিকল্প কোনো মাধ্যম তৈরি হলে মানুষ সেখানে বিনিয়োগ করতো এবং ব্যাংকগুলো থেকে আমানত কমে যেত। মূলত ব্যাংক খাতের দুর্বলতা ও খেলাপি ঋণকে আড়াল করতেই সাধারণ মানুষকে বিকল্প বিনিয়োগে নিরুৎসাহিত করা হয়েছিল। দীর্ঘমেয়াদী ‘ট্রেজারি বন্ড’-এর মাধ্যমে কাগজে-কলমে বিকল্প কিছু ব্যবস্থা থাকলেও, তাকে সাধারণ মানুষের জন্য কখনোই সহজ বা জনপ্রিয় করে তোলা হয়নি।
২০২৬ সালের নির্বাচনে জয়ী হয়ে ক্ষমতায় আসা বিএনপি সরকার অর্থনীতিতে ভারসাম্য ফেরাতে আইএমএফ-এর শর্ত মেনে শৃঙ্খলা বজায় রাখার পক্ষে। তবে তাঁরা জানিয়েছেন, জনস্বার্থবিরোধী এবং জোর করে চাপিয়ে দেওয়া শর্তগুলো পুরোপুরি মানতে তারা নারাজ। বর্তমান অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী স্পষ্ট করেই বলেছেন, আইএমএফ-এর সব শর্ত বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য উপযুক্ত নয়। জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকার সাধারণ মানুষের কাঁধে অতিরিক্ত চাপ দিতে পারে না।
এতকিছুর পরও, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে বর্তমান সরকারও সঞ্চয়পত্র থেকে কম ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করেছে। এতে মধ্যবিত্তের জীবনযাত্রায় নেতিবাচক প্রভাব পড়ার বড় আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ‘বিবিএস’ বা বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যমতে, এদেশের জনসংখ্যার বিশাল একটা অংশই মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত। গত ৫৪ বছরে দেশে এমন কোনো জায়গা তৈরি হয়নি যেখানে মানুষ তাদের পেনশনের টাকা নিশ্চিন্তে জমা রাখতে পারে। শেয়ার বাজার আজও আস্থাহীন। তাই অবসরপ্রাপ্ত এবং নির্দিষ্ট আয়ের মানুষের একমাত্র ভরসাই হলো সঞ্চয়পত্র।
বাজেট ঘাটতি মেটাতে সরকার ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ব্যাংক থেকে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ্য ধরেছে। অন্যদিকে সঞ্চয়পত্র এবং অন্যান্য খাত মিলিয়ে মাত্র ১৫ হাজার কোটি টাকা নেওয়ার কথা বলেছে (যেটি গত অর্থবছরেও ছিল ১৯ হাজার কোটি টাকা)। মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হিসেবে এবার সঞ্চয়পত্রের আয়কে আর ‘ফাইনাল ট্যাক্স লায়াবিলিটি’ বা চূড়ান্ত করদায় হিসেবে ধরা হচ্ছে না। ফলে সঞ্চয়পত্রের আয়ের ওপর মানুষের করের বোঝা বেড়েছে, কমে গেছে চূড়ান্ত মুনাফা।
দ্রব্যমূল্য আর মূল্যস্ফীতির এই বাজারে যখন বাড়িভাড়া থেকে শুরু করে সন্তানের পড়ালেখার খরচ আকাশছোঁয়া, তখন সঞ্চয়পত্রের মুনাফা কমে যাওয়ায় মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো চরম কোণঠাসা হয়ে পড়েছে।
সঞ্চয়পত্র আসলে কেবল বিনিয়োগের জায়গা নয়, এটি লাখো প্রবীণ মানুষের একটি সামাজিক সুরক্ষাবলয় বা ‘সোশ্যাল সেফটি নেট’। সঞ্চয়পত্রের কড়াকড়ির ফলে বাধ্য হয়ে মানুষ হয়তো ব্যাংকে টাকা রাখবে। কিন্তু ব্যাংকে সুদের হার অনেক কম, তার ওপর নানা রকম চার্জ আর মুদ্রাস্ফীতি হিসাব করলে টাকার মান উল্টো আরও কমে যায়। এভাবে চললে মানুষ ভবিষ্যতের জন্য জমানোর উৎসাহই হারিয়ে ফেলবে।
বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতি ও ‘সিপিডি’-এর মতো শীর্ষ গবেষণা সংস্থাগুলো বলছে, কোনো নিরাপদ ও স্থায়ী বিকল্প ব্যবস্থা না করে সঞ্চয়পত্রের পথ আটকে দিলে মধ্যবিত্ত চরম বিপর্যয়ের মুখে পড়বে। মূল্যস্ফীতির চাপে মানুষ এখন জমানো টাকা ভেঙে খাচ্ছে।
আমাদের দেশের অর্থনীতি মূলত ‘ট্রেডিং’ (বাণিজ্য) ও ‘সার্ভিস’ (সেবা) খাতের ওপর নির্ভরশীল। বিশ্লেষকেরা বলছেন, অর্থনীতি চাঙা করতে এবং ব্যাপক কর্মসংস্থান তৈরি করতে ভারী শিল্পের বিকল্প নেই। ‘এক্সপোর্ট ডাইভারসিফিকেশন’ বা রপ্তানি পণ্যের বহুমুখীকরণের জন্যও কাঠামোগত বিনিয়োগ দরকার। কিন্তু এবারের বাজেটে তার জোরালো কোনো দিকনির্দেশনা নেই। নতুন চাকরি ও উদ্যোক্তা তৈরি না হওয়ার ফলে এমনিতেই মধ্যবিত্তের চাকরির বাজার সংকুচিত হচ্ছে, মানুষ সঞ্চয়পত্রের ওপর আরও বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়ছেন।
এই অবস্থায় নীতিনির্ধারকদের উচিত মধ্যবিত্ত শ্রেণীর বাঁচার কথা ভেবে অন্তত সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার একটা সহনীয় পর্যায়ে রাখা। একই সাথে, নাগরিকদের জন্য নির্ভরযোগ্য ও আকর্ষণীয় বন্ডের মতো নতুন বিকল্প স্থায়ী বিনিয়োগ মাধ্যম গড়ে তোলা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।
---
*লেখক: নির্বাহী সম্পাদক, ঢাকা পেপারস।
ইমেইল: [email protected]



