পতিসরের সমবায় বনাম গ্রামীণ ব্যাংক: মানবিক উন্নয়ন বনাম কর্পোরেট কিস্তি-শিকার

শফি রহমান
শফি রহমান
প্রকাশ: ১৫ অক্টোবর ২০২৬, ১৫:১০পরিবর্তন করতে ক্লিক করুন
পতিসরের সমবায় বনাম গ্রামীণ ব্যাংক: মানবিক উন্নয়ন বনাম কর্পোরেট কিস্তি-শিকার
শেয়ার করুন:

স্রেফ ক্ষুদ্রঋণ দিয়ে কাঠামোগত দারিদ্র্য দূর করা সম্ভব নয়, যদি না সেখানে প্রকৃত কর্মসংস্থান ও বাজারব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটে। কৃষক ঋণের জালে জড়িয়ে এক এনজিওর কিস্তি শোধ করতে অন্য এনজিও থেকে ঋণ নেয়। এই “ঋণের ওপর ঋণ” নেওয়ার মহোৎসবে কৃষকের আয় বাড়লেও তার নিট সম্পদ দিনশেষে শূন্য বা ঋণাত্মক।

আজ ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে যখন আমরা সামষ্টিক অর্থনীতির চটকদার প্রবৃদ্ধি আর ক্ষুদ্রঋণের জয়গান শুনি, তখন ইতিহাস আমাদের দিকে তাকিয়ে মৃদু উপহাস করে। এই উপমহাদেশে প্রাতিষ্ঠানিক কৃষি ব্যাংক এবং জামানতবিহীন ক্ষুদ্রঋণের আদি জনক কোনো আধুনিক এনজিও মোগল নন, বরং তিনি ছিলেন কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। ১৯০৫ সালে নওগাঁর পতিসরে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন “পতিসর কৃষি সমবায় ব্যাংক”। উদ্দেশ্যটা আজকের চটকদার ‘উদ্যোক্তা তৈরি’ বা ‘নারীর ক্ষমতায়ন’-এর মোড়কে ব্যবসা করা ছিল না; উদ্দেশ্য ছিল মহাজনদের রাহুগ্রাস থেকে দরিদ্র প্রজা ও কৃষকদের নিঃশর্ত মুক্তি।

অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেনের কল্যাণ অর্থনীতির দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখলে, রবীন্দ্রনাথের ব্যাংকের মূল দর্শন ছিল “মানবিক একাত্মতা”। আজকের গ্রামীণ ব্যাংক বা এনজিওগুলোর সঙ্গে তাঁর ব্যাংকের পার্থক্য কেবল ঋণ দেওয়ার নীতি বা সস্তা মানবিকতায় নয়, বরং দর্শনের মৌলিক জায়গায়। রবীন্দ্রনাথ কৃষককে “গ্রাহক” বা “ঋণগ্রহীতা” ভাবেননি, ভেবেছেন আত্মনির্ভরশীলতার অংশীদার। আধুনিক এনজিওগুলো যেখানে ঋণ দিয়ে প্রতি সপ্তাহে কিস্তি আদায়ের জন্য দরজায় গিয়ে দাঁড়ায় এবং ঋণের টাকায় কী হলো তা না দেখে কেবল ক্যাশ-ফ্লো নিশ্চিত করতে চায়, রবীন্দ্রনাথ সেখানে ঋণ দেওয়ার পাশাপাশি বিজ্ঞানসম্মত চাষাবাদ, উন্নত বীজ সরবরাহ এবং ট্রাক্টর আমদানির মতো সমন্বিত কৃষি সংস্কার করেছিলেন। আধুনিক ক্ষুদ্রঋণ ব্যবস্থা যেখানে দরিদ্রকে চিরকাল “দরিদ্র” রেখে ঋণের চক্রে আটকে রাখার এক নীরব প্রাতিষ্ঠানিক নকশা, রবীন্দ্রনাথের উদ্যোগ ছিল সেই চক্র ভেঙে ফেলার এক নিঃস্বার্থ প্রয়াস।

৩০০% বনাম ২৪%-এর চাতুরী: সুদের হিসাব ও কিস্তি আদায়ের মহাজনী কৌশল

তৎকালীন জোতদার-মহাজনেরা যেখানে কৃষকদের ওপর বার্ষিক প্রায় ৩০০% পর্যন্ত চড়া সুদ চাপিয়ে দিত, সেখানে রবীন্দ্রনাথের পতিসর ব্যাংক ঋণ দিত মাত্র বার্ষিক ৭% থেকে ১২% সরল সুদে। আর আজকের নোবেলজয়ী গ্রামীণ ব্যাংক বা বৃহৎ এনজিওগুলোর সুদের হিসাব বোঝার জন্য একজন সাধারণ মানুষকে নির্ঘুম রাত কাটাতে হয়। কাগজে-কলমে মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটি কর্তৃক সর্বোচ্চ সার্ভিস চার্জের সীমা ২৪% বেঁধে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু ফ্ল্যাট রেট নামক সুদের এক জাদুকরী অঙ্কের আড়ালে এই এনজিওগুলো কার্যত ২৭% থেকে ৩০% পর্যন্ত কার্যকর সুদের হার আদায় করে যাচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক নীতিমালা এবং এমআরএ-এর তদারকি এই সুদের চাতুরী নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হচ্ছে। গ্রামীণ ব্যাংক এবং এনজিওগুলো এই নীতিমালাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে বিভিন্ন নামে “বীমা প্রিমিয়াম”, “ভর্তির ফি” ও “বাধ্যতামূলক সঞ্চয়” কেটে রেখে ঋণের প্রকৃত ব্যয় বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে। আদায়ের কৌশলের কথা ভাবলে তো প্রাচীন কাবুলিওয়ালাদেরও লজ্জা পাওয়ার কথা। পতিসর কৃষি সমবায় ব্যাংকে কিস্তি দেওয়ার জন্য কোনো কৃষকের ঘরের টিন খুলে নেওয়া হতো না, কিংবা গোয়াল থেকে শেষ সম্বল গরুটা টেনে আনা হতো না। সেখানে ঋণের ভিত্তি ছিল পারস্পরিক বিশ্বাস ও ফসল তোলার মরশুম। আর আধুনিক আদায়ের কৌশল? প্রতি সপ্তাহের নির্দিষ্ট দিনে এনজিও কর্মীর সেই কর্কশ ডাক, কিস্তি দিতে না পারলে দলগত চাপের নামে সামাজিকভাবে লাঞ্ছিত করা এবং শেষমেশ কৃষকের আয়ের উৎসটাই কেড়ে নেওয়া। গ্রামীণ ব্যাংকের এই আদায়ের কৌশলকে নোবেল কমিটি “সামাজিক পুঁজি” বললেও, গণমানুষের অর্থনীতিবিদদের চোখে এটি আসলে একধরনের “মনস্তাত্ত্বিক দাসত্ব”।

নোবেলের অর্থায়ন, রুরাল ইনডেটেডনেস অ্যাক্ট এবং পতিসর ব্যাংকের ট্র্যাজেডি

১৯১৩ সালে রবীন্দ্রনাথ যখন সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পান, তখন তিনি পুরস্কারের সম্পূর্ণ অর্থ (প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার টাকা) এই পতিসর ব্যাংকের মূলধন হিসেবে দান করে দেন। মুদ্রাস্ফীতি এবং ক্রয়ক্ষমতার সূচক বিবেচনা করে একজন অর্থনীতিবিদের দৃষ্টিকোণ থেকে বলা যায়, ১৯১৩ সালের সেই টাকার অর্থনৈতিক তুল্যমূল্য ২০২৬ সালের বাজারে প্রায় ২৫ থেকে ৩০ কোটি টাকার সমান। এটি কোনো লোকদেখানো সিএসআর তহবিল ছিল না, ছিল কৃষকের প্রতি নিরেট দায়বদ্ধতা। এখন প্রশ্ন আসতেই পারে, অন্য নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস কি তাঁর ২০০৬ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কারের অর্থ গ্রামীণ ব্যাংকে মূলধন হিসেবে দিয়েছিলেন? না, নোবেল কমিটির নথি ও ঐতিহাসিক রেকর্ড অনুযায়ী, ড. ইউনূস তাঁর পুরস্কারের অর্থ (প্রায় ১.৪ মিলিয়ন ডলার) মূলত নিজের নামে গঠিত একটি সামাজিক ব্যবসায়িক তহবিল ‘ইউনূস সোশ্যাল বিজনেস’ এবং অলাভজনক ট্রাস্টে বিনিয়োগ করেছিলেন, গ্রামীণ ব্যাংকের মূলধনে সরাসরি দান করেননি।

রবীন্দ্রনাথের ব্যাংকটি প্রায় ২৫ বছর চলার পর কেন বন্ধ হয়েছিল? এর পেছনে মূল কারণ ছিল কৃষকদের লাগাতার ফসলহানি ও মহামন্দার কারণে সঞ্চিত বকেয়া। তবে কফিনে শেষ পেরেকটি ঠুকেছিল ব্রিটিশ সরকারের “বেঙ্গল এগ্রিকালচারাল ডেটরস অ্যাক্ট” (১৯৩৫) এবং পরবর্তীতে “রুরাল ইনডেটেডনেস অ্যাক্ট” (১৯৩৮)। এই আইনের অধীনে গঠিত “ঋণ সালিশী বোর্ড” কৃষকদের সমস্ত মহাজনী ঋণ একতরফাভাবে মওকুফ বা বছরের পর বছর স্থগিত করার সুযোগ দেয়। আইনের উদ্দেশ্য মহাজনদের শোষণের হাত থেকে বাঁচানো হলেও, এর ফাঁদে পড়ে পতিসরের মতো সমবায়ী ব্যাংকগুলোর প্রদানকৃত ঋণের টাকা আটকে যায়, যা পরবর্তীতে বিশ্বভারতী সংসদের ১৯৪৪ সালের নথিতে “Bad Debt” বা খেলাপি ঋণ হিসেবে তালিকাভুক্ত হয়। মহাজনদের শোষণের হাত থেকে কৃষকদের বাঁচাতে আনা এই আইনটি উল্টো পতিসর ব্যাংকের জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়, কারণ এর ফলে ব্যাংকের দেওয়া ঋণ আইনিভাবে আদায় করার পথ রুদ্ধ হয়ে যায়। কৃষকেরা ঋণ শোধ করা বন্ধ করে দিলে আমানতকারীদের টাকা ও কবির নোবেল পুরস্কারের পুরো পুঁজিটাই চিরতরে ডুবে যায়।

“ক্ষুদ্রঋণ” নাকি “ঋণের ফাঁদ”? ২০২৬-এর বিআইডিএস রিপোর্ট

পতিসর ব্যাংকের মাধ্যমে দরিদ্র কৃষক মহাজনের দাসত্ব থেকে দম নেওয়ার একটা জায়গা খুঁজে পেয়েছিল। কিন্তু বর্তমানের এনজিও ও ক্ষুদ্রঋণদানকারী সংস্থাগুলোর ঋণ গ্রহণ করে এ দেশের কৃষকদের ভাগ্যের কি আদৌ কোনো পরিবর্তন হয়েছে? অর্থনীতিবিদ জোসেফ স্টিগলিৎস এবং অন্যান্য উন্নয়ন অর্থনীতিবিদদের মতে, ক্ষুদ্রঋণের প্রতিষ্ঠাতারা দারিদ্র্য দূরীকরণে এর ক্ষমতাকে “অতিমূল্যায়ন” করেছিলেন। স্রেফ ক্ষুদ্রঋণ দিয়ে কাঠামোগত দারিদ্র্য দূর করা সম্ভব নয়, যদি না সেখানে প্রকৃত কর্মসংস্থান ও বাজারব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটে। কৃষক ঋণের জালে জড়িয়ে এক এনজিওর কিস্তি শোধ করতে অন্য এনজিও থেকে ঋণ নেয়। এই “ঋণের ওপর ঋণ” নেওয়ার মহোৎসবে কৃষকের আয় বাড়লেও তার নিট সম্পদ দিনশেষে শূন্য বা ঋণাত্মক। প্রবৃদ্ধির সিঁড়িতে চড়ানোর নাম করে কৃষককে আসলে এক অন্তহীন চোরাবালিতে আটকে রাখা হয়েছে, যেখানে সে যত হাত-পা ছোড়ে, তত বেশি তলিয়ে যায়। অতি সাম্প্রতিক ২০২৬ সালের এক গবেষণা রিপোর্ট আমাদের মুখের ওপর কঠিন সত্যটা ছুড়ে দিয়েছে: দরিদ্র কৃষকের আয়ের সিংহভাগই চলে যায় এনজিওর ঋণ ও সুদের কিস্তি পরিশোধ করতে। ১২ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ এবং আইএফপিআরআই-এর যৌথ গবেষণায় এক ভয়জাগানিয়া তথ্য উঠে এসেছে।

এই রিপোর্টে দেখা গেছে যে, গ্রামীণ এলাকার দরিদ্রতম ২০ শতাংশ পরিবারের ৭৯ শতাংশই তাদের আয়ের ৪০ শতাংশের বেশি অংশ ব্যয় করে কেবল ঋণ এবং সুদের কিস্তি পরিশোধ করতে গিয়ে। ১৫ বছর আগে (২০১০ সালে) যেখানে এই হার ছিল মাত্র ৪৯ শতাংশ, আজ তা আকাশ ছুঁয়েছে। একজন কৃষক এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে সার, বীজ বা গবাদিপশু কিনছেন, সত্য; কিন্তু উচ্চ সুদের কারণে সেই উৎপাদন থেকে অর্জিত আয়ের সিংহভাগই চুষে নিচ্ছে এনজিওর কিস্তি। আরও ভয়াবহ তথ্য হলো, প্রায় ৪৯% দরিদ্র পরিবার একটি এনজিওর কিস্তি শোধ করার জন্য অন্য এনজিও বা স্থানীয় মহাজনের কাছ থেকে নতুন করে ঋণ নিচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই ক্ষুদ্রঋণ গ্রামীণ দরিদ্রদের দারিদ্র্যসীমার ওপরে তুলছে না, বরং তাদের একটি অন্তহীন “ঋণের চক্রে” আটকে রাখছে।

বাংলাদেশের প্রান্তিক কৃষকেরা যাবে কার কাছে?

তাহলে বাংলাদেশের এই প্রান্তিক কৃষকেরা ২০২৬ সালের এই নতুন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতায় যাবে কার কাছে? ২০২৬ সালের নির্বাচিত কিংবা ক্ষমতাসীন সরকারের কি আসলেই কিছুই করার নেই? বিশ্বব্যাংকের অতি সাম্প্রতিক “বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট” রিপোর্ট বলছে, কৃষিতে সরকারের দেওয়া সারে ভর্তুকির প্রায় অর্ধেকটাই চলে যাচ্ছে দেশের মাত্র ২০ শতাংশ বড় ও ধনী কৃষকদের পকেটে। আর দেশের ৪০ শতাংশ ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষক পাচ্ছে ভর্তুকির মাত্র ১৩ শতাংশ। কী নির্মম রসিকতা।

অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেনের “ক্যাপাবিলিটি অ্যাপ্রোচ” বা সক্ষমতা তত্ত্বের আলোকে সরকারকে স্রেফ ঋণের বোঝা না বাড়িয়ে, কৃষকদের ফসলের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে হবে, মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য থামাতে হবে এবং কৃষি অর্থনীতিবিদ এম. এস. স্বামীনাথনের দর্শনের মতো উৎপাদন খরচের অন্তত দেড় গুণ দাম কৃষকের পকেটে পৌঁছানোর ব্যবস্থা করতে হবে। গ্রামীণ ব্যাংক আর এনজিওগুলোর এই সুদের মচ্ছব বন্ধ করতে বাংলাদেশ ব্যাংককে কেবল ঠুঁটো জগন্নাথ নীতি জারি রাখলে চলবে না, বরং কঠোর তদারকির মাধ্যমে কার্যকর সুদের হার এক অঙ্কে নামিয়ে আনতে বাধ্য করতে হবে। অন্যথায়, ২০২৬ সালেও আমাদের কৃষকেরা ১০০ বছর আগের সেই তিমিরেই রয়ে যাবে, শুধু শোষকের গায়ের চামড়া আর প্রাতিষ্ঠানিক নামটুকুই যা বদলাবে।

-- --

লেখক: নির্বাহী সম্পাদক, ঢাকা পেপার্স।

শেয়ার করুন: