চট্টগ্রাম বন্দরের চাবিকাঠি যখন দুবাইয়ের হাতে: জাতীয় সক্ষমতার অপমৃত্যু


ডিপি ওয়ার্ল্ডের আন্তর্জাতিক ট্র্যাক রেকর্ড কিন্তু খুব একটা মসৃণ বা নিষ্কলঙ্ক নয়। বিশ্বের যেসব দেশে তারা বন্দর পরিচালনার চুক্তি করেছে, তার বহু জায়গায় তীব্র জাতীয় বিতর্ক এবং নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশ নামক ভূখণ্ডের নীতি নির্ধারকদের একটা ব্যাপারে কুর্নিশ করতেই হয়, ক্ষমতার পালাবদল হতে পারে, রাজপথের স্লোগান বদলাতে পারে, কিন্তু “জাতীয় সম্পদ বিদেশিদের হাতে তুলে দেওয়ার” মহৎ ধারাবাহিকতায় কোনো ছেদ পড়ে না। চট্টগ্রাম বন্দরের হৃৎপিণ্ড হিসেবে পরিচিত সবচেয়ে বড় টার্মিনাল, নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) পরিচালনার দায়িত্ব শেষমেশ ১৫ বছরের জন্য দুবাই ভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ডের জিম্মায় ছেড়ে দেওয়া হলো। যে বিএনপি একসময় ডিপি ওয়ার্ল্ডকে বন্দর ইজারা দেওয়ার উদ্যোগে বিরোধিতা করেছিল, তারাই নির্বাচিত হয়ে ক্ষমতায় বসার পর সব “বাধা” উপেক্ষা করে এই চুক্তি সম্পন্ন করল। একেই বোধহয় বলে ক্ষমতার চিরন্তন কৌতুক।
কাগজ-কলমের চুক্তি: কে কতটুকু পেল আর সার্বভৌমত্ব কোথায় রইল?
এই চুক্তির গোড়াপত্তন কিন্তু বর্তমান বিএনপি সরকারের নিখাদ আবিষ্কার নয়। এর বীজ বপন করা হয়েছিল ২০২৩ সালের মার্চে শেখ হাসিনা সরকারের আমলে, যখন পিপিপি পদ্ধতিতে আন্তর্জাতিক অপারেটর নিয়োগের নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়। এরপর ডঃ ইউনুসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় চুক্তি চূড়ান্ত করার মরিয়া চেষ্টা চলে, যা শ্রমিক আন্দোলনের মুখে চলতি বছরের (২০২৬) ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের আগে থমকে গিয়েছিল। এখন নির্বাচিত বিএনপি সরকার এসে সেই ঝুলন্ত চুক্তিকে পরম মমতায় বুকে টেনে নিয়েছে। ল্যান্ডলর্ড-পোর্ট মডেলের এই চুক্তিতে বলা হয়েছে, জমি আর অবকাঠামোর মালিকানা চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষেরই থাকবে। বাহ! জমি আপনার, কিন্তু ব্যবসা করবে অন্যজন। অবশেষে বর্তমান সরকারের আমলে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়াল অ্যাডমিরাল এস এম মনিরুজ্জামান এবং ডিপি ওয়ার্ল্ডের চেয়ারম্যান এসা কাজিম চুক্তিপত্রে স্বাক্ষর করলেন।
চুক্তি অনুযায়ী, আগামী ১৫ বছর ডিপি ওয়ার্ল্ড এই টার্মিনাল রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচালনা করবে এবং ব্যবহারকারীদের কাছ থেকে মাশুল বা ট্যারিফ আদায় করবে। বিনিময়ে বন্দর কর্তৃপক্ষকে তারা এককালীন এবং বার্ষিক নির্দিষ্ট ফি প্রদান করবে। চুক্তিপত্রে ডিপি ওয়ার্ল্ডের পক্ষ থেকে নতুন প্রযুক্তি স্থাপন ও নতুন বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি রয়েছে, যদিও অর্থনীতির বিশ্লেষকরা বলছেন তার সিংহভাগই আমাদের আমদানি-রপ্তানিকারকদের পকেট কেটেই উসুল করা হবে। লাভ-লোকসানের বণ্টন প্রক্রিয়ায় আন্তর্জাতিক নিয়ম মেনে ডিপি ওয়ার্ল্ড তাদের লভ্যাংশ সরাসরি দুবাইতে নেয়ার আইনি বৈধতা পাচ্ছে। আর যদি ডিপি ওয়ার্ল্ড শর্ত অনুযায়ী পারফর্ম করতে ব্যর্থ হয়? ক্ষতিপূরণের ধারা চুক্তিতে থাকলেও, আন্তর্জাতিক কর্পোরেট লবিংয়ের সামনে বাংলাদেশের মতো রাষ্ট্রের সেই টাকা আদায় করার রেকর্ড কতটা করুণ, তা অর্থনীতিবিদ রেহমান সোবহান কিংবা আনু মুহাম্মদের পুরোনো অর্থনৈতিক বিশ্লেষণগুলো স্মরণ করলেই অনুমেয়। তবে লভ্যাংশ বণ্টনের প্রক্রিয়া বা ডিপি ওয়ার্ল্ডের ব্যর্থতায় ক্ষতিপূরণের কড়া ধারাগুলো এবং চুক্তিটি বাংলাদেশের আইন নাকি কোনো আন্তর্জাতিক সালিশি আদালতের অধীনে পরিচালিত হবে—তা স্রেফ এককালীন আপফ্রন্ট ফি আর রয়্যালটি আদায়ের গল্পে ঢাকা পড়ে গেছে।
লাভজনক এনসিটি এবং দেশীয় সক্ষমতার অপমৃত্যু
নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) কোনো লোকসানি প্রতিষ্ঠান ছিল না। দেশের সবচেয়ে বড় এবং স্বয়ংসম্পূর্ণ এই টার্মিনালটি লাভজনকভাবে পরিচালিত হচ্ছিল। তাহলে একে কেন ব্যক্তিমালিকানায়, তাও আবার বিদেশি কোম্পানির হাতে তুলে দিতে হলো? সরকার বাহাদুর বলছেন “আধুনিকীকরণ” এবং “বিশ্বমানের সক্ষমতা” অর্জনের জন্য এটি নাকি জরুরি ছিল। কিন্তু প্রশ্ন হলো, যে আধুনিকীকরণের জন্য বিদেশি প্রতিষ্ঠানের দ্বারস্থ হতে হলো, তা কি বাংলাদেশ সরকার নিজে উদ্যোগ নিয়ে করতে পারত না? অবশ্যই পারত।
অর্থনীতিবিদদের মতে, এনসিটি থেকে অর্জিত মুনাফা দিয়েই টার্মিনালটিকে আরও আধুনিক প্রযুক্তিতে সজ্জিত করা সম্ভব ছিল। এতে বাংলাদেশের নিজস্ব প্রযুক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা গড়ে উঠত। কিন্তু নিজস্ব সক্ষমতা তৈরি করলে তো আর বিদেশি কনসোর্টিয়ামের কাছ থেকে অদৃশ্য সুবিধা পাওয়া যায় না! এই চুক্তির ফলে সবচেয়ে বড় আশঙ্কার মুখে পড়েছেন এনসিটির সাধারণ শ্রমিক-কর্মচারীরা। ডিপি ওয়ার্ল্ড যখন তাদের নিজস্ব “দক্ষ ব্যবস্থাপনা” এবং অটোমেশন চালু করবে, তখন কর্মরত শত শত শ্রমিক কাজ হারাবেন অথবা ঠিকাদারি প্রথার অধীনে আরও নির্মম শোষণের শিকার হবেন। আমাদের নীতিনির্ধারকদের কাছে দেশের শ্রমিকের পেটে লাথি পড়ার চেয়ে দুবাইয়ের শেখদের তুষ্ট করাটাই যে বেশি লাভজনক, তা আবারও প্রমাণিত হলো।
তিন সরকারের অভিন্ন চরিত্র এবং নিশ্চুপ পার্লামেন্ট
এই চুক্তির দায় কিন্তু শুধু বর্তমান সরকারের একার নয়। শেখ হাসিনা সরকার এই আত্মঘাতী প্রক্রিয়ার সূচনা করেছিল, ডঃ ইউনুসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার একে লালন-পালন করে ফাইল চূড়ান্ত করেছে, আর বর্তমান নির্বাচিত বিএনপি সরকার এসে ফিতা কেটেছে। অর্থাৎ, মোড়ক ভিন্ন হলেও বাংলাদেশের সার্বভৌম সম্পদ বিলিয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে সব সরকারের চরিত্রই এক এবং অভিন্ন।
সবচেয়ে লজ্জাজনক অধ্যায়টি রচিত হয়েছে আমাদের বর্তমান নির্বাচিত জাতীয় সংসদে। যে চুক্তি দেশের অর্থনৈতিক নিরাপত্তার সাথে সরাসরি জড়িত, তা নিয়ে সংসদে কোনো আলোচনা বা বিতর্কের প্রয়োজনই মনে করেনি সরকার। তার চেয়েও বড় তামাশা হলো সংসদে বিরোধী দলগুলোর ভূমিকা। তারা জনগণের ভোটাধিকার বা রাজনৈতিক চালবাজি নিয়ে যতটা উচ্চকণ্ঠ, দেশের প্রধান বন্দর বিদেশিদের হাতে তুলে দেওয়ার মতো জাতীয় ইস্যুতে তারা ততটাই মৌন ও নির্বিকার। এই তথাকথিত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় জনগণের সম্মতি নেওয়ার কোনো বালাই নেই। বাইরে যখন বামপন্থী দলগুলো কিংবা সাধারণ বন্দর রক্ষা আন্দোলনকারীরা বিক্ষোভ করছে, তখন তাদের ওপর চলছে পুলিশের লাঠিচার্জ। বাংলাদেশের সাধারণ জনগণ তবে কার কাছে যাবে? যেখানে শাসক দল, এবং সংসদে বিরোধী দল, সবাই একযোগে কর্পোরেট পুঁজির সামনে নতজানু।
আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা: ডিপি ওয়ার্ল্ডের আগ্রাসন ও নিরাপত্তার ফাঁদ
ডিপি ওয়ার্ল্ডের আন্তর্জাতিক ট্র্যাক রেকর্ড কিন্তু খুব একটা মসৃণ বা নিষ্কলঙ্ক নয়। বিশ্বের যেসব দেশে তারা বন্দর পরিচালনার চুক্তি করেছে, তার বহু জায়গায় তীব্র জাতীয় বিতর্ক এবং নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। ২০০৬ সালের বিখ্যাত ‘ডিপি ওয়ার্ল্ড লুজিয়ানা বির্তক’-এর কথা মনে করা যাক। তৎকালীন বুশ প্রশাসন আমেরিকার গুরুত্বপূর্ণ ছয়টি বন্দর ডিপি ওয়ার্ল্ডের কাছে ইজারা দিতে চেয়েছিল। কিন্তু মার্কিন কংগ্রেসে ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান—উভয় দলের তীব্র বিরোধিতা এবং জাতীয় নিরাপত্তার ইস্যুতে তীব্র প্রতিবাদের মুখে ডিপি ওয়ার্ল্ড মার্কিন বন্দর ছাড়তে বাধ্য হয়েছিল। মার্কিন নীতিনির্ধারকরা তাদের দেশের নিরাপত্তা কোনো বিদেশি আরব আমিরাতের কোম্পানির হাতে ছাড়তে রাজি হননি।
একইভাবে জিবুতি কিংবা ইয়েমেনের এডেন বন্দরে ডিপি ওয়ার্ল্ডের একচেটিয়া আধিপত্যের ফলে দেশগুলোর অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়েছিল, যার ফলশ্রুতিতে জিবুতি সরকার পরবর্তীতে ডিপি ওয়ার্ল্ডের চুক্তি বাতিল করতে বাধ্য হয়। অর্থনীতিবিদ জোসেফ স্টিগলিটজ তাঁর বিভিন্ন গবেষণায় দেখিয়েছেন যে, উন্নয়নশীল দেশগুলোতে পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ বা কৌশলগত ইজারার নামে আন্তর্জাতিক মনোপলি কোম্পানিগুলো কীভাবে রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদী রাজস্ব শুষে নেয়। অন্যান্য দেশে যেখানে সংসদ উত্তাল হয়, নিরাপত্তা নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ হয়, সেখানে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে বসে নিঃশব্দে সই হয়ে যায় বাংলাদেশের ভাগ্যের দলিল।
সবশেষে বলা যায়, চট্টগ্রাম বন্দরের এই চাবি হস্তান্তরের মাধ্যমে আমরা হয়তো তথাকথিত “বিশ্বমানের গতি” পাব, কিন্তু বিনিময়ে যে জাতীয় আত্মমর্যাদা ও অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব হারালাম, তার মূল্য চড়া সুদে দিতে হবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে। সরকার আসে, সরকার যায়, কিন্তু দেশের সম্পদ পরের হাতে তুলে দেওয়ার এই ঐতিহাসিক ট্র্যাডিশন সমহিমায় বেঁচে থাকে। ধন্যবাদ আমাদের দূরদর্শী নীতিনির্ধারকদের।
-- --
লেখক: নির্বাহী সম্পাদক, ঢাকা পেপারস।



