কোনো ভুল করবেন না—বামপন্থীরা জয়ের ধারায়

ব্রাংকো মার্সেটিক
ব্রাংকো মার্সেটিক
প্রকাশ: ৯ আগস্ট ২০২৬, ১৩:২২পরিবর্তন করতে ক্লিক করুন
কোনো ভুল করবেন না—বামপন্থীরা জয়ের ধারায়

বাম থেকে ডানে: মিশিগান স্টেট রিপ্রেজেন্টেটিভ ডনোভান ম্যাককিনি, ইউএস রিপ্রেজেন্টেটিভ অ্যালেক্সান্ড্রিয়া ওকাসিও-কোরতেজ, ডেমোক্রেটিক পার্টির মিশিগান সিনেট প্রার্থী আব্দুল এল-সায়েদ, ইউএস সেনেটর বার্নি স্যান্ডার্স, ইউনাইটেড অটো ওয়ার্কার্স (UAW)-এর প্রেসিডেন্ট শন ফেইন এবং ইউএস রিপ্রেজেন্টেটিভ রাশিদা তালাইব। ১৮ জুলাই ২০২৬, ডেট্রয়েট, মিশিগান।

শেয়ার করুন:

মিশিগান প্রাইমারিতে বিপুল অর্থের শক্তি ও ইসরায়েল লবির বাধা পেরিয়ে বামপন্থীদের বড় জয়। আবদুল আল-সাঈদের ঐতিহাসিক সাফল্য এবং ডেমোক্র্যাটিক দলের ভেতরের পরিবর্তিত মনস্তত্ত্ব নিয়ে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষণ।

(এই লেখাটি ভোটগণনা চলাকালীন সময়ে প্রকাশিত হয়)

১৮ জুলাই, ২০২৬ তারিখে মিশিগানের ডেট্রয়েটে মিশিগান স্টেট রিপ্রেজেন্টেটিভ ডোনভান ম্যাককিনি, রিপ্রেজেন্টেটিভ আলেকজান্দ্রিয়া ওকাসিও-কোর্টেজ, মিশিগান ডেমোক্র্যাটিক সিনেট প্রার্থী আবদুল আল-সাঈদ, সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্স, ইউএডব্লিউ সভাপতি শন ফেইন এবং রিপ্রেজেন্টেটিভ রাশিদা তালাইব।

ডেমোক্র্যাটিক দলের ভোটারদের মধ্যে পরিবর্তন স্পষ্ট।

গত বছর নিউইয়র্কের মেয়র নির্বাচনে জোহরান মামদানির কাছে দলীয় প্রতিষ্ঠিত নেতা অ্যান্ড্রু কুওমোর বড় পরাজয় থেকে বিষয়টি প্রথম নজরে আসে। এর সাত মাস পর প্রতিষ্ঠিত বর্তমান নেতাদের হারিয়ে আরও বেশ কয়েকজন সমাজতন্ত্রীর বিজয় ধারাটিকে স্পষ্ট করেছে। এছাড়া মেইনের প্রাইমারিতে ডেমোক্র্যাটিক ভোটাররা নিজেদের গভর্নরকেই প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। তার বদলে তাঁরা এমন একজন বাম-পপুলিস্ট বা বামপন্থী জননেতার পক্ষ নেন, যিনি কেলেঙ্কারিতে জড়ালেও কখনো কোনো রাজনৈতিক পদে ছিলেন না।

ইসরায়েল লবি-সমর্থিত মধ্যপন্থী কংগ্রেস সদস্য হ্যালি স্টিভেন্সকে হারিয়ে মিশিগানে আবদুল আল-সাঈদের জয় সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য। বিস্তৃত বামপন্থী এবং গণতন্ত্রের জন্য নিবেদিত মানুষদের কাছে সম্ভবত সবকিছুকে ছাড়িয়ে যাবে এ অর্জন।

বিপুল অর্থের বাধা পেরিয়ে এর আগে কোনো প্রার্থী এভাবে জয় পেয়েছেন—এমন নজির খুব কম। স্টিভেন্স বাইরের গোষ্ঠীগুলোর কাছ থেকে নয় গুণ বেশি অর্থ পেয়েছিলেন। টিভিতে অন্তহীন বিজ্ঞাপন দিয়ে আল-সাঈদকে ক্রমাগত আক্রমণ করা হয়েছিল। পাশাপাশি প্রচার করা হয় বারাক ওবামার এক অস্তিত্বহীন সমর্থন। ২০২৪ সালে সাবেক সমাজতন্ত্রী আইনপ্রণেতা জামাল বোম্যান হেরে গিয়েছিলেন। আল-সাঈদকে তার চেয়ে প্রায় চার গুণ বেশি অর্থের প্রতাপ মোকাবিলা করতে হয়েছে।

অর্থের দাপটের ওপর সাধারণ মানুষের শক্তিও যে জয়ী হতে পারে, আল-সাঈদের জয় তার প্রমাণ। নভেম্বরের সাধারণ নির্বাচনের ফলের ওপর ভিত্তি করে বলা যায়, এই জয় ডেমোক্র্যাটিক দলের মধ্যপন্থীদের একটি বহু পুরোনো যুক্তির কফিনে শেষ পেরেক ঠুকে দিতে পারে। সেটি হলো—সমাজতন্ত্রী ও বামঘরানার প্রার্থীদের নাকি কেবল উপকূলীয় এলাকা বা বড় শহরের 'ডিপ-ব্লু' অঞ্চলগুলোতেই জনপ্রিয়তা আছে।

এ ধারণা অবশ্য কখনোই সত্য ছিল না। উদাহরণস্বরূপ ২০১৬ সালে মিশিগান প্রাইমারিতে সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্সের জয়। এছাড়া ডেট্রয়েটে রাশিদা তালাইব ও মিনিয়াপোলিসে ইলহান ওমরের মধ্য দিয়ে একেবারে শুরুতেই 'স্কোয়াড' জয় পেয়েছিল। গত এক দশকে মধ্যপশ্চিমে স্থানীয় ও রাজ্য পর্যায়ে সমাজতন্ত্রীদের বিজয়ের ধারাও এ সাক্ষ্য দেয়।

শিকাগো ও মিনিয়াপোলিস সিটি কাউন্সিলে সমাজতন্ত্রী ব্লক উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। তবে সিনেট নির্বাচন সাধারণত গোটা রাজ্যজুড়ে হয়। আর মিশিগান রাজ্যে ডেমোক্র্যাট প্রার্থীকে হারিয়ে দুবার জিতেছিলেন ট্রাম্প। এমন পরিবেশে আল-সাঈদের জয় সাধারণ ভোটারদের কাছে আগের নির্বাচনী সাফল্যগুলোর তুলনায় অনেক বেশি তাৎপর্য বহন করে।

তারপরও বাস্তবতা অস্বীকার করার মানসিকতা সহজে যায় না। গত বুধবার সকালে পলিটিকোর এক খবরে বলা হয়, ‘প্রগতিশীলরা প্রত্যাশা অনুযায়ী নির্বাচন পার করতে পারেনি।’ এছাড়া বাম-বিমুখ ভাষ্যকাররা সেদিন সকালে তাড়াহুড়ো করে জয়ের নতুন ও অযৌক্তিক সংজ্ঞা দাঁড় করাতে চাইলেন। তাঁদের মতে, কেবল নির্বাচনে জেতাই প্রকৃত বিজয় নয়, বরং বিশাল ব্যবধানে জেতাটাই হলো আসল।

অথচ মিশিগান বামপন্থীদের জন্য একটি খারাপ রাত ছিল, এমন কথা বলা বেশ কঠিন। বার্নি স্যান্ডার্সের সমর্থন পাওয়া ছয় প্রার্থীর মধ্যে পাঁচজনই রাজ্যটিতে জিতেছেন। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন ডেমোক্র্যাটিক সোশ্যালিস্টস অব আমেরিকা (ডিএসএ) সদস্য ডোনভান ম্যাককিনি। নিরাপদ নীল আসন হিসেবে পরিচিত মিশিগানের ১৩তম কংগ্রেসনাল ডিস্ট্রিক্ট থেকে তাঁর যুক্তরাষ্ট্রের হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভসের সদস্য হওয়া প্রায় নিশ্চিত। এর ফলে কংগ্রেসের নিম্নকক্ষে তিনি হবেন নবম সমাজতন্ত্রী।

পাশাপাশি তাঁর অন্তর্ভুক্তি বামপন্থী স্কোয়াডের আকার বাড়িয়ে ডজনখানেকের কোঠায় নিয়ে যেতে পারে। অন্যদিকে দোদুল্যমান সপ্তম কংগ্রেসনাল ডিস্ট্রিক্টে জয় পেয়েছেন সানরাইজ মুভমেন্টের সহপ্রতিষ্ঠাতা উইলিয়াম লরেন্স। এর আগে এই আসনটি মধ্যপন্থী ডেমোক্র্যাট সিনেটর এলিসা স্লটকিনের দখলে ছিল। গত রাতের ওই ত্রিমুখী লড়াইয়ে স্লটকিনের সমর্থনপুষ্ট প্রার্থী অবশ্য তৃতীয় হয়েছেন।

স্যান্ডার্সের সমর্থন পাওয়া বিজয়ীদের তালিকায় আছেন আব্বাস আলাউয়িও। তিনি আনকমিটেড মুভমেন্টের সহপ্রতিষ্ঠাতা। গত বছর ডেমোক্র্যাটিক ন্যাশনাল কনভেনশনে তিনি আনকমিটেড ডেলিগেট ছিলেন। গাজা গণহত্যায় কমলা হ্যারিসের Positions বা অবস্থানের প্রতিবাদে শিকাগোতে তিনি একটি অবস্থান ধর্মঘটেরও নেতৃত্ব দিয়েছিলেন।

তিনি ১৮ পয়েন্টের আরামদায়ক ব্যবধানে জিতে স্টেট সিনেট প্রাইমারিতে সফল হন। ডিএসএর আরও দুজন সদস্যও জিতেছেন: কাউন্টি কমিশনার ইউসেফ রাবি ও ক্রিস গিলমার-হিল। রাবি অ্যান আর্বরের চার মেয়াদের চলতি মেয়রকে অনায়াসে হারান। অন্যদিকে আল-সাঈদ এবং ডিএসএর মেট্রো ডেট্রয়েট শাখার সমর্থন নিয়ে মিশিগানের অষ্টম ডিস্ট্রিক্টের প্রতিনিধিত্ব করার লড়াইয়ে প্রাইমারিতে জয়লাভ করেছেন গিলমার-হিল। এমন একটা রাতও যদি প্রগতিশীলদের পছন্দ না হয়, তাহলে ধরে নিতে হবে তারা আসলেই হারতে চেয়েছিলেন।

এক ঢিলে দুই পাখি

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খবর হিসেবে সঙ্গত কারণেই আল-সাঈদের বিজয়কে সামনে রাখা হচ্ছে।

ডেমোক্র্যাটিক দলের প্রতিষ্ঠিত নেতৃত্বকে ভোটারদের আরেক দফা প্রত্যাখ্যানের ঘটনা এটি। একে ট্রাম্প ২.০ যুগে দলটির অন্যতম চেনা চিত্র বলা যেতে পারে। দলীয় প্রতিষ্ঠিত নেতৃত্ব স্টিভেন্সকে জেতানোর জন্য সর্বশক্তি প্রয়োগ করেছিলেন। সিনেট সংখ্যালঘু নেতা চাক শুমার তাঁর জন্য দাতাদের সমর্থন নিশ্চিত করেন। আর ডেমোক্র্যাটিক সেনেটোরিয়াল ক্যাম্পেইন কমিটির চেয়ারম্যান সিনেটর ক্রিস্টেন গিলিব্র্যান্ড দৌড়ে থাকা অপর এক মধ্যপন্থী প্রার্থীকে মিথ্যাভাবে ডিএসএ সদস্য আখ্যা দিয়ে দাতাদের ভুল তথ্য দিয়েছিলেন বলে খবর আসে। গত বছর জোহরান মামদানির বিরুদ্ধে 'গ্লোবাল জিহাদ' নিয়ে মন্তব্য করার মিথ্যা অভিযোগ তুলেছিলেন এই গিলিব্র্যান্ডই।

মিশিগানের জনপ্রিয় গভর্নর গ্রেচেন হুইটমার এবং পরিচিত নাম রিপাবলিকান জিম ক্লাইবার্নের শেষ মুহূর্তের সমর্থনও স্টিভেন্সের কাজে আসেনি। মধ্যপন্থী সহকর্মী হিলারি স্কোলটেন নারীবিদ্বেষী ও আমেরিকা-বিরোধী বলে আল-সাঈদের সমালোচনা করেন এবং সাধারণ নির্বাচনে তাঁকে সমর্থন না দেওয়ার আভাস দেন। স্কোলটেন এ বছর বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হলেও বর্তমানে ঝুঁকির মুখে। কারণ তাঁর ডিস্ট্রিক্টের পশ্চিমাংশের তিনটি কাউন্টিতে আল-সাঈদ ৫৮ শতাংশ ভোট পেয়েছেন।

এ লড়াইয়ের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক ছিল বিপুল পরিমাণ ডানপন্থী অর্থের বাধা পেরিয়ে আল-সাঈদের জয়। এতে ইসরায়েলপন্থী লবিরও বড় পরাজয় হয়েছে।

মাত্র কয়েক বছর আগেও ইসরায়েলপন্থী গোষ্ঠীগুলো বড় অঙ্কের অর্থ ঢেলে ডেমোক্র্যাটিক দলের প্রাইমারির ফলাফল নির্ধারণ করত। সেগুলোর অন্যতম লক্ষ্য ছিল পরিচিত প্রগতিশীল প্রার্থীরা। স্টিভেন্স নিজেও এমন কৌশলের সুবিধাভোগী। ২০২২ সালে আমেরিকান ইসরায়েল পাবলিক অ্যাফেয়ার্স কমিটি (এআইপ্যাক)-এর পলিটিক্যাল অ্যাকশন комите 'ইউনাইটেড ডেমোক্র্যাসি প্রজেক্ট' (ইউডিপি) তাঁর পেছনে ত্রিশ লাখ ডলারেরও বেশি লগ্নি করে। এই বিপুল অর্থে ভর করে স্টিভেন্স মিশিগানের পরিচিত প্রগতিশীল প্রার্থী এবং প্রাক্তন আইনপ্রণেতা অ্যান্ডি লেভিনের বিরুদ্ধে বড় জয় তুলে নিয়েছিলেন।

ইউডিপি লেভিনের বিরুদ্ধে এমন এক প্রচারণা চালিয়েছিল যেখানে ইসরায়েলের নামই উল্লেখ ছিল না। তবে এআইপ্যাকের তৎকালীন সভাপতি প্রকাশ্যে তাঁকে মার্কিন-ইসরায়েল সম্পর্কের ‘সবচেয়ে ক্ষতিকর সদস্য’ বলে আক্রমণ করেন। লেভিন নিজে ছিলেন গর্বিত জায়নবাদী এবং প্রাক্তন এক সিনাগগ প্রেসিডেন্ট। তাঁর মূল অপরাধ ছিল ইসরায়েলে মার্কিন সহায়তায় শর্ত জুড়ে দেওয়ার প্রস্তাব রাখা। দ্বিরাষ্ট্রীয় সমাধান রক্ষার তাগিদে তিনি ওই পথে হেঁটেছিলেন। স্টিভেন্স ওই লড়াইয়ে শেষমেশ ২০ পয়েন্টের বিশাল ব্যবধানে জেতেন। ডিস্ট্রিক্টটিতে স্টিভেন্সের বাসস্থল অকল্যান্ড কাউন্টির বড় অংশও পড়েছে।

আবার শুধু ভোটারদের এই পরিবর্তনই আল-সাঈদের জয়ের ব্যাখ্যা নয়। ডেমোক্র্যাটিক ভোটারদের অবস্থান বদলালেও কেবল সেটির ওপর ভর করে যে তাঁর জয় এসেছে, তা নয়; তাঁকে ও তাঁর অনুসারীদের কিছু কৌশলগত সিদ্ধান্তও নিতে হয়েছে।

অঢেল অর্থ রাজনীতিতে কতটা প্রভাব ফেলে, সে সময় সেটিকে তার একটি অশনিসংকেত হিসেবেই ভাবা হয়েছিল। কিন্তু এবারের হিসাবে তা ছিল খুবই সামান্য। স্টিভেন্সকে জেতাতে ইউডিপি এবার তিন কোটি ২০ লাখ ডলার ব্যয় করেছে। কংগ্রেস নির্বাচনে এটাই ইউডিপির এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ ব্যয়। অন্য বিভিন্ন কর্পোরেট স্বার্থের গোষ্ঠী ঢেলেছে আরও তিন কোটি ডলার। ফলে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের বাইরে অঙ্গরাজ্যটির ইতিহাসে এটি সবচেয়ে ব্যয়বহুল প্রাইমারি। আর যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে এটি তৃতীয় ব্যয়বহুল সিনেট প্রাইমারিও। এবার দুই প্রার্থীর মৌলিক রাজনৈতিক অবস্থানের পার্থক্য এবং রাজনৈতিক মন্তব্যে ইসরায়েল ইস্যুটি সরাসরি কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসে।

নিউইয়র্কের নির্বাচনে অ্যান্ড্রু কুওমো যেমন ইসরায়েলকে নিঃসঙ্কোচে আলিঙ্গন করে ঝুঁকি নিয়েছিলেন, স্টিভেন্সও একই কাজ করেছেন। অথচ মার্কিন জনমতেও ইসরায়েল এখন আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় খারাপ অবস্থানে। আল-সাঈদের ইসরায়েল সমালোচনাকে তাই স্টিভেন্স ইস্যু করতে চেয়েছিলেন। হাসান পিকারের মতো সমালোচকদের সঙ্গে তাঁর মেলামেশাকে ব্যবহার করে আল-সাঈদকে কার্যত অ্যান্টিসেমিট বা ইহুদিবিদ্বেষী হিসেবে প্রচার করা হয়। তবে কুওমোর মতোই এই কৌশল ডেমোক্র্যাটিক দলের ২০২৪ সালের পরিবর্তিত ভোটারদের মনস্তত্ত্ব পড়তে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়। হ্যালি স্টিভেন্স কংগ্রেসে অকল্যান্ড কাউন্টির প্রতিনিধি। এখানেই তাঁর জন্ম ও বেড়ে ওঠা। অথচ নিজের সেই কাউন্টিতেই এবার তিনি জিতেছেন মাত্র ৬ পয়েন্টের ব্যবধানে; যা তাঁর ২০২২ সালের সাফল্যের তুলনায় একেবারেই ম্লান।

একই রাতে আলাউয়ি ও ম্যাককিনিও জিতেছেন। ম্যাককিনি এমন এক পদাধিকারীর বিরুদ্ধে জিতেছেন, যিনি গত ৭ অক্টোবরের পর হঠাৎ আবার অন্ধ-ইসরায়েলপন্থী হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করতে ব্যস্ত হয়েছিলেন এবং সমাজতন্ত্রীদের সঙ্গে দূরত্ব বজায় রাখা শুরু করেন। তাঁদের পাশাপাশি আল-সাঈদের এমন অর্জন এ যাবৎকালের সবচেয়ে স্পষ্ট প্রমাণ যে ডেমোক্র্যাটিক দলের রাজনীতি এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সম্পর্কের প্রশ্নে সাধারণ ভোটারদের মধ্যে মৌলিক বদল এসেছে।

তবে মূল নীতিগুলোর ব্যাপারে অনড় থেকেও আল-সাঈদ অনেক বিষয়েই নরম সুর ধরেন। তিনি সমাজতন্ত্রী নন—এটি খোলাখুলি বলা সত্ত্বেও মাঠপর্যায়ের বহু ডিএসএ সদস্য তাঁকে দৃঢ়ভাবে সমর্থন দেন। এর পেছনে মিশিগানের গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্রীদের কৌশলগত হিসাব ছিল। তাঁরা দেখেছেন কিছু মূল বিষয়ে—যেমন 'সবার জন্য মেডিকেয়ার', ধনীদের ওপর করারোপ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রতিষ্ঠানগুলোকে সরকারি ব্যবস্থাপনার আওতায় আনার বিষয়ে তাঁদের সঙ্গে আল-সাঈদের পুরোপুরি মিল আছে। নিজের প্রচারে তাদের অংশগ্রহণ প্রকাশ্যে স্বাগত জানিয়ে আল-সাঈদ নিজেই বৃহত্তর ঐক্য তৈরির সুযোগ করে দেন।

এক সময় 'ডিফান্ড দ্য পুলিশ' বা পুলিশের বাজেট বাতিলের পক্ষে সমর্থন দিলেও পরে আল-সাঈদ সেখান থেকে সরে আসেন। ওয়েইন কাউন্টির ডেপুটি শেরিফ সমিতির সমর্থনও লাভ করেন তিনি; ঠিক যে পথে নিজের ক্যারিয়ার পোক্ত করতে এগিয়েছিলেন খোদ বার্নি স্যান্ডার্স। এর বাইরে আল-সাঈদ একটি ইতিবাচক ও দেশপ্রেমমূলক অবস্থান থেকে নিজের প্রচার সাজিয়েছিলেন। 'আমেরিকা ফার্স্ট'-এর মতো বক্তব্যকে নিজস্ব একটি বাম ঘরানায় এনে ইসরায়েলের সমালোচনা করেন। ফলস্বরূপ কেউ তাঁকে ক্ষতিকর 'বহিরাগত' বা উগ্র বলে আক্রমণ করলেও সেটি মাঠে মার খেয়েছে।

প্রসঙ্গক্রমে একজন আরব-আমেরিকান ও মুসলিম পরিচয়ে আল-সাঈদের উঠে আসার ইতিহাস তৈরি করা দিকটিকে ছোট করে দেখার সুযোগ নেই। দেশে আরববিদ্বেষ ও ইসলামভীতি বাড়ার এই সময়ে প্রথম কোনো মার্কিন মুসলিম সিনেটরের উদ্ভব একটি বড় ব্যাপার হতে চলেছে। এই বর্ণবাদ ও ধর্মান্ধতা এখন মানুষের কেবল মুখের মন্তব্যেই আটকে নেই; তা রাজনৈতিক বক্তৃতা আর বাস্তব কার্যক্রমেও স্থান করে নিচ্ছে। এর অন্যতম নজির ট্রাম্পের দেওয়া মুসলিম নিষেধাজ্ঞা, মুসলিম দুনিয়ার বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের শুরু করা একাধিক যুদ্ধ কিংবা প্রতিষ্ঠিত মূল ধারার নীতিপ্রণেতাদের বক্তব্য।

এটি যে কেবল ডানপন্থীদের ভেতরে আছে তা-ও নয়। খোদ ডেমোক্র্যাটিক দলের ভেতরের চরম ও সূক্ষ্ম বর্ণবাদী প্রচারণাও মোকাবিলা করেছেন আল-সাঈদ। ১৮ বছর আগে অমুসলিম ওবামাকে নিশানা করে জন ম্যাককেইন যেমন এক সূক্ষ্ম বর্ণবাদী প্রচারণা চালিয়েছিলেন, আল-সাঈদের বিরুদ্ধে চালানো প্রচার ছিল অনেকটা তারই ডেমোক্র্যাট রূপ। তবে এমন প্রচারণায় প্রতিপক্ষকেই বারবার বিরূপ পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছে।

এই জয় এলেও সামনের দিনগুলোতে এ রকম বিদ্বেষ পুরোপুরি বিদায় নেবে বলে ভাবা অমূলক। রিপাবলিকানরা সাধারণ নির্বাচনে স্বাভাবিকভাবেই আরও খোলামেলাভাবে আক্রমণ করতে পারে। তবে সে বাধা পার হয়ে আসতে পারলে আল-সাঈদের জয় যুক্তরাষ্ট্রের মূল ধারার সহনশীল রাজনীতির পথে একটা বড় মাইলফলক হবে।

নির্বাচন যেহেতু ধীরে ধীরে মূল পরিণতির দিকে যাচ্ছে, তখন অন্তত দুটি ব্যাপার নিশ্চিত ধরে নেওয়া যায়: আবারও শোনা যাবে বামপন্থীদের ভরাডুবি ঘটতে যাচ্ছে। আর সেই কথা সত্যি করতে আইপ্যাকসহ অন্য বৃহৎ দাতা গোষ্ঠীগুলো আরও বেপরোয়া মাত্রায় অর্থের থলি উপুড় করবে। কিন্তু এরপরও আল-সাঈদের এই জয়টি মনে করিয়ে দেয়, কঠোর একাগ্রতা আর শ্রম দিয়ে কোটি টাকার বিপুল পাহাড় ডিঙিয়ে অপর পারে বেঁচেবর্তে যাওয়া কোনো অসম্ভব কিছু নয়।

'জ্যাকোবিনে প্রকাশিত'
--
লেখকঃ মার্কিন সাংবাদিক

শেয়ার করুন: