বাংলাদেশের পাট নীতি: সম্ভাবনা নাকি দীর্ঘশ্বাস?

শফি রহমান
শফি রহমান
প্রকাশ: ২৯ জুন ২০২৬, ১০:৫৫পরিবর্তন করতে ক্লিক করুন
বাংলাদেশের পাট নীতি: সম্ভাবনা নাকি দীর্ঘশ্বাস?

ছবি: উইকি

শেয়ার করুন:

পাটের ভবিষ্যৎ নিয়ে কেবল আক্ষেপ করলে হবে না, বরং বাস্তবমুখী ও প্রতিযোগিতামূলক বৈশ্বিক রাজনীতির সমীকরণে একে স্থাপন করতে হবে। যদি সঠিক নীতি ও প্রণোদনা নিশ্চিত করা যায়, তবে আগামী পাঁচ বছরে পাট খাত থেকে ৫ থেকে ৭ বিলিয়ন ডলার রপ্তানি আয় করা অবাস্তব নয়।

 

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে 'পাট' কেবল একটি কৃষিপণ্য নয়, বরং এটি এক ঐতিহাসিক ও আবেগের অবিচ্ছেদ্য অংশ। একসময় যা ছিল বাঙালির ‘সোনালি আঁশ’, আজ তা নীতিগত স্থবিরতা, বাজেটীয় উদাসীনতা এবং কৌশলগত দূরদর্শিতার অভাবে অস্তিত্বের সংকটে নিমজ্জিত। অথচ বিশ্ব যখন প্লাস্টিক বর্জন করে পরিবেশবান্ধব তন্তুর দিকে ঝুঁকছে, তখন বাংলাদেশের সামনে পাটের মাধ্যমে দ্বিতীয় এক অর্থনৈতিক বিপ্লবের হাতছানি ছিল। বিশেষ করে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) গ্রিন ডিল এবং বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে ন্যাচারাল ফাইবারের (প্রাকৃতিক তন্তু) ক্রমবর্ধমান চাহিদা বাংলাদেশের সামনে এক অভূতপূর্ব অর্থনৈতিক সম্ভাবনা তৈরি করেছে।

 

বর্তমান সরকার যদি এই খাতে একটি আধুনিক, বিজ্ঞানসম্মত ও বাস্তবায়নযোগ্য নীতিমালা গ্রহণ করে, তবে এটি দেশের তৈরি পোশাক শিল্পের (আরএমজি) বিকল্প বা শক্তিশালী পরিপূরক হিসেবে অন্যতম বৃহত্তম বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারী খাতে রূপান্তরিত হতে পারে।

 

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও সোনালি দিনের স্মৃতি

 

পাটের অগ্রযাত্রা শুরু হয়েছিল ১৯৫১ সালে নারায়ণগঞ্জে আদমজী জুট মিলস প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে এটি ছিল আধুনিক শিল্পায়নের সূচনা। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৯০ শতাংশই আসত পাট ও পাটজাত পণ্য থেকে। দেশের বিকাশমান মধ্যবিত্ত শ্রেণি এবং গ্রামীণ অর্থনীতির মেরুদণ্ড দাঁড়িয়ে ছিল এই পাটের ওপর। কিন্তু আশির দশকে সিন্থেটিক বা প্লাস্টিক পণ্যের আগ্রাসন এবং পরবর্তীতে বিশ্বব্যাংকের বিতর্কিত ‘কাঠামোগত সমন্বয় কর্মসূচির’ (এসএপি) ভুল নীতিমালার খড়গ পড়ে এই শিল্পে। ফলে লোকসানের বৃত্তে বন্দি হতে থাকে রাষ্ট্রায়ত্ত কলগুলো। চূড়ান্ত পরিনতিতে ২০২০ সালে লোকসানের অজুহাতে বাংলাদেশ পাটকল কর্পোরেশনের (বিজেএমসি) অধীনস্থ ২৬টি রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলের উৎপাদন সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়া হয়, যা কয়েক হাজার শ্রমিকের জীবনকে অনিশ্চয়তায় ঠেলে দেয়।

 

বাজেটীয় অবহেলা ও প্রযুক্তিগত পিছিয়ে পড়া

 

বিগত দুই দশকের জাতীয় বাজেট বিশ্লেষণ করলে তৈরি পোশাক (আরএমজি) বা তথ্যপ্রযুক্তি (আইসিটি) খাতের তুলনায় পাট খাতের প্রতি বিমাতাসুলভ আচরণ স্পষ্ট ধরা পড়ে। গার্মেন্টস শিল্প যেভাবে নীতিগত ও আর্থিক সুরক্ষা পেয়েছে, সরকারি পাটকলগুলো তা থেকে বঞ্চিত থেকেছে। শিল্প আধুনিকায়নের জন্য বাজেটে পর্যাপ্ত বরাদ্দ কখনোই রাখা হয়নি।

 

অর্থনীতিবিদদের মতে, রাষ্ট্রায়ত্ত কলগুলোর লোকসানের পেছনে শিল্পের ব্যর্থতা নয়, বরং ‘ঘোস্ট ওয়ার্কার’ বা ভুয়া শ্রমিক তৈরি, কাঁচাপাট ক্রয়ে প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি এবং প্রকট আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দায়ী ছিল। আধুনিক স্পিনিং ও উইভিং মেশিন ব্যবহারে বেসরকারি মিলগুলো যেখানে উৎপাদন খরচ কমিয়ে মুনাফা করছিল, সেখানে বিজেএমসির অধীনে থাকা মেশিনারিগুলো ছিল পাকিস্তান আমলের। প্রযুক্তির এই বিশাল ব্যবধানের ফলে সরকারি মিলগুলোতে প্রতি টন পাটের উৎপাদন খরচ বেসরকারি খাতের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যায়। দুঃখজনকভাবে, ২০২১-২২ থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বাজেটগুলোতেও আধুনিকায়নের চেয়ে গোল্ডেন হ্যান্ডশেক বা শ্রমিকদের বকেয়া মেটাতেই বেশি মনোযোগ দেওয়া হয়েছে। ফলে গবেষণামূলক উন্নয়ন রয়ে গেছে শূন্যের কোটায়।

 

বৈশ্বিক গ্রিন ডিল: নতুন সম্ভাবনা ও প্রতিযোগিতার মঞ্চ

 

বর্তমানে বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে পাট শিল্পের পুনরুদ্ধারের এক স্বর্ণালী সুযোগ তৈরি হয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের ‘গ্রিন ডিল’ (গ্রিন ড্রিল) -এর লক্ষ্য হলো ২০৫০ সালের মধ্যে ইউরোপকে প্রথম কার্বন-নিরপেক্ষ মহাদেশে রূপান্তরিত করা। এর অধীনে ২০৩০ সালের মধ্যে ডিজিটাল প্রোডাক্ট পাসপোর্ট এবং কার্বন বর্ডার অ্যাডজাস্টমেন্ট মেকানিজম চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। ফলে সিন্থেটিক বা পলিয়েস্টার তন্তুর তৈরি পোশাকের ওপর চড়া কার্বন ট্যাক্স বসবে। বিশ্লেষকদের মতে, পাটের তৈরি ব্যাগের বিশ্ববাজারই ২০২৮ সালের মধ্যে ৪.২ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাবে।

 

অথচ বাংলাদেশের পাট খাত এখনও পুরনো ধাঁচের হেসিয়ান, বস্তা এবং দড়ি তৈরির চক্রেই বন্দি। বিশ্ববাজার যখন উচ্চ মূল্যের ডাইভারসিফাইড জুট প্রোডাক্টস—যেমন পাটের কাপড়, ডেনিম, হোম টেক্সটাইল, এমনকি গাড়ির ইন্টেরিয়র পার্টস চাইছে, আমরা তখন কেবল কাঁচামাল সরবরাহে সীমাবদ্ধ। ভালো মানের তোষা পাটের বীজের জন্য আমাদের এখনও ভারতের ওপর নির্ভরশীল থাকতে হয়। বছরে প্রায় ৬,০০০ টন পাটবীজ আমদানির এই বাধ্যবাধকতা প্রমাণ করে যে, কৃষিজ ও শিল্প নীতির মধ্যে সমন্বয়ের ব্যাপক অভাব রয়েছে।

 

নীতিনির্ধারণী দুর্বলতা ও সমন্বয়ের অভাব

 

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ-এর গবেষণায় উঠে এসেছে যে, পাটের টেকনোলজিক্যাল লিফ পজিশনিং বা প্রযুক্তিগত স্থবিরতাই এই খাতের প্রধান অন্তরায়। ড. মোস্তাফিজুর রহমানের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বাংলাদেশের পাটের গুণগত মান অনন্য হওয়া সত্ত্বেও সঠিক ব্রান্ডিং ও আধুনিক পলিসির অভাবে আমরা উচ্চ মূল্যের প্রিমিয়াম বাজারে ঢুকতে পারছি না। এর পেছনে আরেকটি কারণ হলো সরকারের অতিনির্ভরশীল পোশাককেন্দ্রিক নীতি। নীতিনির্ধারকদের মনোযোগ প্রায় সম্পূর্ণভাবে পোশাক খাতের সুরক্ষায় নিবদ্ধ থাকায় পাট মন্ত্রণালয়ের গুরুত্ব অনেকাংশেই কমেছে। এছাড়া কৃষি মন্ত্রণালয় এবং পাট ও বস্ত্র মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমন্বয়ের অভাবে নতুন আবিষ্কৃত ‘জিনোম সিকোয়েন্সিং’ বা ‘সোনালি ব্যাগের’ মতো উদ্ভাবনগুলো ল্যাবরেটরি থেকে বাণিজ্যিক উৎপাদনের মুখ দেখেনি। রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতার অভাব উদ্ভাবক ও উদ্যোক্তাদের নিরুৎসাহিত করছে।

 

উত্তরণের পথ: কেমন হওয়া উচিত একটি আধুনিক পাট নীতি?

 

ড. হোসেন জিল্লুর রহমান এবং র‍্যাপিড -এর মতো গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সুপারিশ অনুযায়ী, পাট খাতের সংকট সমাধানে কয়েকটি সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ জরুরি। এগুলো হলো

 

মূলধনী বিনিয়োগ ও ইডিএফ সুবিধা: পোশাক খাতের মতো পাটের জন্যও স্বল্প সুদে (২-৩%) রপ্তানি উন্নয়ন তহবিল গঠন করতে হবে। যাতে উদ্যোক্তারা আধুনিক হাই-স্পিড লুম ও টেকনিক্যাল টেক্সটাইল মেশিনারি অনায়াসে আমদানি করতে পারেন।

 

পিপিপি ও বেসরকারীকরণ: বন্ধ থাকা রাষ্ট্রায়ত্ত মিলগুলোকে আমলাতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণমুক্ত করে দক্ষ বেসরকারি ম্যানেজমেন্টের অধীনে লিজ বা সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বে (পিপিপি) ছেড়ে দিতে হবে।

 

শিল্পের পশ্চাৎপদ সংযোগ: বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পের অন্তত ১০-১৫ শতাংশ সুতা পাটের হওয়া বাধ্যতামূলক করার আইনি কাঠামো তৈরি করতে হবে। এতে আমদানিকৃত তুলা বা পলিয়েস্টারের ওপর চাপ কমবে এবং পাটের অভ্যন্তরীণ চাহিদা বাড়বে।

 

গবেষণা ও উদ্ভাবন: পাট গবেষণা ইনস্টিটিউটকে  নিছক গবেষণাগার নয়, বরং একটি ব্যবসায়িক ইনকিউবেটরে রূপান্তরিত করতে হবে, যেন সোনালি ব্যাগের মতো পরিবেশবান্ধব পণ্যের পেটেন্ট আন্তর্জাতিকভাবে কাজে লাগানো যায়।

 

বীজ স্বয়ম্ভরতা: প্রতি বছর প্রতিবেশী দেশ থেকে বীজ আমদানির বদলে কৃষকদের হাইব্রিড বীজের সরবরাহ নিশ্চিত করার জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা জরুরি।

 

পাটের ভবিষ্যৎ নিয়ে কেবল আক্ষেপ করলে হবে না, বরং বাস্তবমুখী ও প্রতিযোগিতামূলক বৈশ্বিক রাজনীতির সমীকরণে একে স্থাপন করতে হবে। যদি সঠিক নীতি ও প্রণোদনা নিশ্চিত করা যায়, তবে আগামী পাঁচ বছরে পাট খাত থেকে ৫ থেকে ৭ বিলিয়ন ডলার রপ্তানি আয় করা অবাস্তব নয়। এর ফলে কেবল বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী হবে না, বরং গ্রামীণ অর্থনীতিতে ১০ থেকে ১৫ লাখ নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। বাংলাদেশের পাট শিল্প আবার হারানো গৌরব ফিরে পাবে কি না, তা নির্ভর করছে বর্তমান সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং আধুনিক একটি ‘মাস্টার প্ল্যান’ বা মহাপরিকল্পনা গ্রহণের ওপর। পাট যেন ‘দীর্ঘশ্বাসের’ কারণ না হয়ে নতুন ‘সম্ভাবনার’ প্রতিশব্দ হয়ে ওঠে—এটাই এখন সময়ের দাবি।

---

*লেখক: নির্বাহী সম্পাদক, ঢাকা পেপারস।

ইমেইল: [email protected]

 

শেয়ার করুন: