যে ভয় থেকে বামপন্থীদের দুর্গখ্যাত যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে হামলা করেছে বিজেপি!

যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের চার নম্বর গেটের বাইরে হিন্দুত্ববাদীদের বিরুদ্ধে বামপন্থী ছাত্রছাত্রীদের প্রতিরোধ
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে গেরুয়া বাহিনীর হামলা, লেনিন মূর্তি ভাঙার অপচেষ্টা এবং মেধা-মনন ও প্রতিস্পর্ধার রাজনীতিকে দমানোর ফ্যাসিবাদী চক্রান্তের রাজনৈতিক মনস্তত্ত্ব নিয়ে বিশ্লেষণ
নয়া দিল্লির যন্তরমন্তর থেকে শুরু করে ছাত্র-জনতার ভারতব্যাপী আন্দোলনের জেরে ভয় পেয়েছে আরএসএস-বিজেপি ও তাদের ছাত্রসংগঠন এবিভিপি। ভয় পেয়েছে বিজেপির ফ্যাসিবাদী ভারতীয় সরকার। এর প্রতিক্রিয়ায় দেশব্যাপী শিক্ষার্থীদের ওপর ক্রমান্বয়ে নামিয়ে আনা হচ্ছে গৈরিক রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস। যারই ধারাবাহিকতায়, ফ্যাসিস্ট আরএসএস-বিজেপি ও ছাত্রসংগঠন-সহ তামাম সংঘ পরিবারের নেতৃত্বে পশ্চিমবঙ্গ-সহ দক্ষিণ এশিয়ায় ঐতিহ্যবাহী ও গরিমান্বিত যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে বুধবার রাতভর চলেছে হামলা।
আরএসএস-বিজেপির গুণ্ডাবাহিনী বুধবার রাত ১০টার পর থেকেই যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের এক নম্বর গেট থেকে শুরু করে চার নম্বর গেট পর্যন্ত ব্যাপক তাণ্ডব চালায়। এক পর্যায়ে গেটের ভেতরে ঢুকে পড়ে গেরুয়া বাহিনী। রাত ১২টা নাগাদ গেরুয়া তাণ্ডবের আকস্মিকতায় বেশ কিছু বামপন্থী ছাত্র-ছাত্রী কী করণীয় বুঝে উঠতে না পেরে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কার্যালয় অরবিন্দ ভবনে আশ্রয় নেন। ততক্ষণে ক্যাম্পাসে ঢুকে পড়েছে বিজেপি-এবিভিপির গুণ্ডাবাহিনী। তারা অরবিন্দ ভবনের গেটে বাইরে থেকে তালা ঝুলিয়ে দেয়। ছাত্রছাত্রীদের সেখানে বন্দি করে রেখে ভবনে আগুন ধরিয়ে দেওয়ারও চেষ্টা করা হয়। কিন্তু এত কিছুর পরেও পুলিশ প্রশাসন বা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তা-রক্ষীদের তরফে হামলাকারীদের প্রতিহত করার কোনো উদ্যোগই দেখা যায়নি।
গোটা ঘটনার সূত্রপাত হয় বুধবার বিকেলে। বিশ্ববিদ্যালয়ে ইঞ্জিনিয়ারিং শাখার ছাত্র সংসদের জেনারেল বডির একটি মিটিং চলছিল। সেখানে এবিভিপির(বিজেপির ছাত্র সংগঠন) কর্মী-সমর্থকেরা ঢুকে গণ্ডগোল পাকানোর চেষ্টা চালান। সেই সময় বামপন্থী ছাত্ররা সেখান থেকে গেরুয়া বাহিনীকে বের করে দিলে তারা রীতিমতো তাদের ওপর হামলা চালানোর মিথ্যা অভিযোগ করে বিশ্ববিদ্যালয়-সংলগ্ন কেপিসি হাসপাতালে ভর্তি হন।
এরপর আসরে নামেন স্থানীয় বিজেপি বিধায়ক শর্বরী মুখোপাধ্যায়। গণমাধ্যমের সামনে তিনি যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়কে বিচ্ছিন্নতাবাদী ও সন্ত্রাসীদের আখড়া আখ্যা দিয়ে তোপ দাগতে থাকেন। তাঁর আক্রমণের লক্ষ্য ছিল নকশালপন্থী বা বিপ্লবী কমিউনিস্ট ছাত্রসংগঠনগুলি-সহ সামগ্রিক বাম ছাত্রসংগঠনগুলি। শর্বরী মুখোপাধ্যায় গণমাধ্যমের সামনেই হুমকি দেন, “দরকার পড়লে সারারাত তাণ্ডব চালাব আমি যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে।” এরপর তাঁর মদতেই শুরু হয় তাণ্ডব। বৃহস্পতিবার ভোর পর্যন্ত তাণ্ডব চলে।
পরে ভোরে ছাত্রছাত্রী, স্থানীয় মানুষ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের প্রতিরোধে পরিস্থিতি কিছুটা শীতল হয়। যদিও এদিন সকালে বাম ও গণতান্ত্রিক ছাত্রসংগঠনগুলি প্রতিবাদ মিছিলের উদ্দেশ্যে জড়ো হন যাদবপুরের লেনিন মূর্তির পাদদেশে। পাল্টা গোলপার্ক রামকৃষ্ণ মিশনের সামনে জমায়েত হন গেরুয়া কর্মী ও লুম্পেন বাহিনী। যদিও পুলিশ দুপক্ষকেই মিছিলে বাধা দেয়।
বামপন্থী ছাত্রসংগঠনগুলি একযোগে অবস্থান শুরু করে। উপস্থিত হন এসএফআই, ডিএসও, আইসা, আরএসএফ-সহ বাম ছাত্রসংগঠনের নেতৃবৃন্দ। উপস্থিত হন সাবেক ছাত্রনেত্রী ও বর্তমানে সিপিএম কর্মী দীপ্সিতা হালদার, এসএফআইয়ের রাজ্য সম্পাদক দেবাঞ্জন দে, বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও সিপিআইএমএল (লিবারেশন) নেতা মানস ঘোষ, গবেষক ও সমাজকর্মী নজরুল আহমেদ, সিপিএম নেত্রী ও গবেষক আফরিন বেগম শিল্পী প্রমুখ। উপস্থিত হন ডিএসও, এআইএফ, আরএসএফের মতো বাম ছাত্রসংগঠনের অগণিত কর্মী-সমর্থক। বিক্ষোভ-অবস্থানে শামিল হন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন পড়ুয়ারাও।
এমনকী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নেতৃত্বাধীন তৃণমূল কংগ্রেসের ছাত্রসংগঠন তৃণমূল ছাত্র পরিষদ এবং কংগ্রেসের ছাত্রসংগঠন ছাত্র পরিষদও বৃহস্পতিবার বামেদের সঙ্গে গেরুয়া বাহিনীর বিরুদ্ধে বিক্ষোভ-অবস্থানে শামিল হয়।
এদিকে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে এবিভিপির কর্মসমিতির সদস্য শুভব্রত অধিকারী দাবি করেন, “বিশ্ববিদ্যালয়ে হামলার সঙ্গে এবিভিপির কোনো সম্পর্ক নেই।” যদিও বিজেপি বিধায়ক শর্বরী মুখোপাধ্যায়ের মুখে হামলার উসকানি প্রসঙ্গে এবিভিপি নেতাকে প্রশ্ন করা হলে তিনি উত্তর দিতে পারেননি। প্রসঙ্গ এড়িয়ে গেছেন।
এরপর ফের বিশ্ববিদ্যালয়ের বামপন্থী ছাত্রসংগঠনগুলির মুখোমুখি অবস্থান নেয় গেরুয়া বাহিনী। তৈরি হয় সংঘর্ষের পরিস্থিতি। চলে স্লোগান, পাল্টা স্লোগান। এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস-সহ গোটা যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে উত্তেজনাকর পরিস্থিতি বিরাজ করছে।
এদিন অবস্থান-বিক্ষোভে শামিল হয়ে এসএফআই নেতা দেবাঞ্জন দে বলেন, “পুলিশ আমাদের যাত্রাপথ অবরুদ্ধ করে রেখেছে, নইলে আমরা বিজেপি-আরএসএস-এবিভিপির গুণ্ডাবাহিনীকে বুঝিয়ে দিতে পারি। ওরা ভয় পেয়ে হামলা চালাচ্ছে। আমরা ওদের উচিত শিক্ষা দিতে প্রস্তুত। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বজরঙ্গী হনুমান বাহিনীকে উৎখাত করতে আমরা প্রস্তুত।”
অধ্যাপক মানস ঘোষ এদিন বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ও পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তিনি বলেন, “যেভাবে গেরুয়া বাহিনী হামলা চালিয়েছে, তা অকল্পনীয়। অথচ বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ নীরব। পুলিশ নীরব। এটা মেনে নেওয়া যায় না। প্রতিবাদ জানাচ্ছি।”
গবেষক নজরুল আহমেদ বলেন, “বহু বছর ধরে ভারতের কৃতী সন্তান তৈরি করে আসছে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়। সেই বিশ্ববিদ্যালয়ে আক্রমণ চালাল আরএসএসের ছাত্রসংগঠন এবিভিপির গুণ্ডারা। ৩০ জন শিক্ষার্থীকে ক্যাম্পাসে বন্দি করে রেখে বাইরে থেকে আগুন জ্বালানো হলো। পুড়িয়ে দেওয়া হলো ক্যাম্পাসের সমস্ত লাল পতাকা। মেন হস্টেলের ছাত্রদের ওপরেও হামলা চালানোর চেষ্টা করা হলো।”
উল্লেখ্য, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররাজনীতি অসংসদীয় বা প্রতিষ্ঠানবিরোধী বিপ্লবী বাম ছাত্ররাজনীতির পীঠস্থান। তাই বরাবরই বিভিন্ন শাসকের রক্তচক্ষুর শিকার হয়েছে এই বিশ্ববিদ্যালয়। পুলিশ দিয়ে ছাত্র আন্দোলন দমন করার নজিরও আছে। কিন্তু এভাবে গুণ্ডাবাহিনী পুলিশের নাকের ডগা দিয়ে ক্যাম্পাসে ঢুকে হামলা চালানোর দৃষ্টান্ত এই প্রথম।
বিজেপি ২০১৪ সাল থেকেই ভারতের জেএনইউ, জামিয়া মিলিয়া, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়-সহ বেশ কিছু শিক্ষাঙ্গনকে কড়া নজরে রেখেছে। জেএনইউয়ের পাশাপাশি যাদবপুরেও কেন্দ্রের বিজেপি জমানায় আগেও হামলার চেষ্টা হয়েছে। কিন্তু এবারের হামলা অতীতের সব রেকর্ডকে ছাড়িয়ে গেছে।
২০২৬ সালের মে মাসে পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় আসার পরেই বিজেপির টার্গেটের মধ্যে পড়ে বামপন্থীরা। বিশেষত নকশালপন্থীরা। ‘যাদবপুর নকশালদের আস্তানা’—এই প্রোপাগান্ডাকে সামনে রেখে গেরুয়া শিবির ক্যাম্পাস দখলে মরিয়া, কারণ যাদবপুরে গেরুয়া বাহিনী বা হিন্দুত্ববাদীদের খুঁজে পাওয়া দুষ্কর।
আরেকটি বিষয় হলো, সম্প্রতি বাংলার ইতিহাস-ঐতিহ্যকে মুছে তার গৈরিকীকরণেও তৎপর বিজেপি। এর জন্য তারা বহু রাস্তার নামও পরিবর্তন করছে। এ ক্ষেত্রে কমিউনিস্ট ও মুসলিম—এই দুই বর্গকে নিশ্চিহ্ন করতে তৎপর আরএসএস-বিজেপি। এই সূত্রেই কলকাতার লেনিন সরণি বা সোহরাওয়ার্দী অ্যাভিনিউয়ের নাম পরিবর্তন তাদের অ্যাজেন্ডা। এই অ্যাজেন্ডা ইতিমধ্যেই বাস্তবায়িত হতে শুরু করেছে।
আর সেই সূত্রেই কলকাতার ধর্মতলা ও যাদবপুরের লেনিন ভাস্কর্য এখন বিজেপির টার্গেট। যাদবপুর ক্যাম্পাসের বাইরেই এইট-বি বাসস্ট্যান্ডের সামনে অধিষ্ঠিত লেনিন মূর্তিটি ভাঙতে তৎপর বিজেপি-সহ হিন্দুত্ববাদী শিবির। ভুয়া বয়ান ও ইতিহাস বিকৃতিতে ওস্তাদ এই হিন্দুত্ববাদী শিবিরকে তাই বলতে শোনা যাচ্ছে, বাংলা ভাগের দায় নাকি লেনিনের।
গত শতাব্দীর বিশের দশকের সূচনাতেই স্বল্পায়ু বিপ্লবী লেনিন এই ধরাধাম থেকে বিদায় নেন। অথচ ‘হোয়াটসঅ্যাপ ইউনিভার্সিটি’র মগজধোলাই হওয়া হিন্দুত্ববাদীরা বলতে শুরু করেছে, লেনিনের জন্যই দেশভাগ। এমনকী কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বদৌলতে একটি ভুয়া চিঠিও বাজারে ঘুরছে। যেখানে দেখা যাচ্ছে, লেনিন নাকি ১৯৪৭ সালে একটি চিঠিতে মাউন্টব্যাটেনকে বলছেন, বাংলা ও পাঞ্জাব ভাগ করো।
এই হাস্যকর প্রোপাগান্ডাকে ভিত্তি করে যাদবপুরের লেনিন মূর্তি ভাঙার চেষ্টা করে হিন্দুত্ববাদীরা, যেখান থেকেই তাদের সঙ্গে নতুন করে সংঘাত শুরু হয় যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের বামপন্থী ছাত্রদের। আর সেই সংঘাত ক্রমশ পর্যবসিত হলো যাদবপুরে গেরুয়া বাহিনীর হামলায়।
আসলে বিজেপি-আরএসএস মেধা, মনন ও প্রজ্ঞাকে ভয় পায়। তারা ঔপনিবেশিক শক্তির মতোই চায় অনুগত এক ভবিষ্যৎ প্রজন্ম, যারা প্রশ্ন করবে না, বাদ-প্রতিবাদে জড়াবে না। কিন্তু যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররাজনীতির ইতিহাস প্রতিস্পর্ধার; ক্ষমতাকে প্রশ্ন করা, স্বৈরাচার ও ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার কাজটা যাদবপুরে ষাট-সত্তরের দশক থেকেই চলছে।
তাই এই বিশ্ববিদ্যালয়কে এত ভয় গেরুয়া ফ্যাসিস্টদের। অন্যদিকে, ‘ককরোচ জনতা পার্টি’র উত্থান ও দেশব্যাপী গড়ে ওঠা ছাত্র-জনতার আন্দোলনেও তারা ভীত। আর তাই মেধা ও মননের চর্চা করা ছাত্র থেকে বুদ্ধিজীবীদের ‘দিমাগি নকশাল’ আখ্যা দিয়েছেন খোদ মোদি। ‘দিমাগ’ শব্দের অর্থ বুদ্ধি বা মেধা। যারা বুদ্ধি ও মেধার প্রয়োগের মাধ্যমে সুস্থ, গণতান্ত্রিক চিন্তা করেন এবং সাম্য, মৈত্রী ও সহাবস্থানের সমাজ গড়তে চান, তাঁদের ‘দিমাগি নকশাল’ বলছেন স্বয়ং ভারতের প্রধানমন্ত্রী।
যাদবপুরের ছাত্রছাত্রীরা তো সত্যিই ‘দিমাগি নকশাল’। আর তাই এত রাগ গোমূত্রপান করা হিন্দুত্ববাদী শিবিরের।
লেখক: কবি, প্রাবন্ধিক ও সাংবাদিক, কলকাতা, ভারত।
ইমেইল- [email protected]



