ফিফার বাণিজ্যিকীকরণ ও ফুটবলের কান্না


ছবি: ফিফার ফেসবুক পেজ
২০১৬ সালের চক্রের পর থেকে ফিফার আয় চক্রবৃদ্ধি হারে বেড়েছে। এর আগ্রাসী ধারাবাহিকতায়, ২০২৬ সালের বিশ্বকাপ চক্রে ফিফা রেকর্ড ১৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার রাজস্ব উপার্জনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে।
ঊনবিংশ শতাব্দীতে শিল্পবিপ্লবের পর ফুটবল ছিল মূলত প্রান্তিক শ্রমিক শ্রেণির এক স্বতঃস্ফূর্ত সামাজিক মিলনমেলা এবং নিখাদ বিনোদনের মাধ্যম। একে বলা হতো গণমানুষের খেলা বা "দ্য বিউটিফুল গেম"। কিন্তু এই বিশুদ্ধ খেলাটিকে বাণিজ্যিক পণ্যে রূপান্তরের প্রক্রিয়া আজ একে এক মাল্টি-বিলিয়ন ডলারের ব্যবসায়িক সাম্রাজ্যে পরিণত করেছে। শ্রমিক শ্রেণির সেই ‘সুন্দর খেলা’ আজ খোদ শ্রমিকদেরই শোষণকারী ব্যবস্থা, নব্য-উদারবাদী পুঁজিবাদ ও বিশ্ব সাম্রাজ্যবাদের মুনাফা লুণ্ঠনের এক বিশাল যন্ত্রে পর্যবসিত।
১৯০৪ সালের ২১ মে প্যারিসে জন্ম নেয় ফিফা। এর প্রাথমিক উদ্দেশ্য ছিল আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ফুটবলের নিয়মকানুন একীভূত করা এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার মাধ্যমে খেলাটির প্রসার ঘটানো; অর্থাৎ, ফুটবলকে একটি অলাভজনক ও অপেশাদার ক্রীড়া হিসেবে টিকিয়ে রাখার ওপরই তখন জোর দেওয়া হয়েছিল। এই দর্শনের ধারাবাহিকতাতেই ১৯৩০ সালে উরুগুয়েতে মাঠে গড়ায় প্রথম ফিফা বিশ্বকাপ। সে সময় খেলাটির অস্তিত্ব আবর্তিত হতো কেবল আবেগ ও জাতীয় মর্যাদার বলয়ে, আর এর সম্প্রচার সীমাবদ্ধ ছিল স্রেফ রেডিও ও সংবাদপত্রের পাতায়। ১৯৫৪ সালের বিশ্বকাপে প্রথম টেলিভিশনের মাধ্যমে সম্প্রচার শুরু হলেও, ফিফার আয়ে বর্তমানের মতো কর্পোরেট স্পনসরশিপের এমন সর্বগ্রাসী থাবা তখনো পড়েনি।
ফিফার ইতিহাসে সবচেয়ে বড় পালাবদলটি ঘটে মূলত ১৯৭৪ সালে, জোয়াও হ্যাভেলাঞ্জ সভাপতির চেয়ারে বসার পর। তিনি ফুটবলের অপার বাণিজ্যিক সম্ভাবনাকে চূড়ান্তভাবে নিংড়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
হ্যাভেলাঞ্জের নেতৃত্বেই ফিফা ‘অ্যাডিডাস’ ও ‘কোকা-কোলা’র মতো বহুজাতিক কোম্পানির সাথে দীর্ঘমেয়াদী চুক্তিতে আবদ্ধ হয়। এখানেই ফুটবলের সাথে মেগা কর্পোরেট ব্র্যান্ডের প্রথম স্থায়ী গাঁটছড়া স্থাপিত হয়। এরপর বিশ্বব্যাপী টেলিভিশনে সরাসরি সম্প্রচারের যুগান্তকারী সুযোগ কাজে লাগিয়ে সম্প্রচার স্বত্ব বিক্রির মাধ্যমে আকাশচুম্বী মুনাফা ঘরে তোলা শুরু করে ফিফা।
আজকের দিনে ফিফা ফুটবলকে আক্ষরিক অর্থেই একটি বহুমুখী বিনোদন ও বাণিজ্যিক পণ্যে পরিণত করেছে। এর কর্পোরেটীকরণ এমন চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, ফিফা বিশ্বকাপের মতো মেগা ইভেন্টগুলো এখন সম্পূর্ণভাবে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের মার্কেটিং এবং স্পনসরশিপ চুক্তির আজ্ঞাবহ। সম্প্রচার স্বত্ব, টিকিট বিক্রি এবং কর্পোরেট স্পনসরশিপ—সব মিলিয়ে ফিফার আয় এখন অতীতের সমস্ত রেকর্ডকে ছাড়িয়ে গেছে। মজার ব্যাপার হলো, ফিফা কোনো সাধারণ ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মতো প্রতিদিন পণ্য বেচে আয় করে না; এদের অতিকায় ব্যবসায়িক মডেলটি আবর্তিত হয় মূলত চার বছর অন্তর আয়োজিত বিশ্বকাপকে কেন্দ্র করে। ২০১৬ সালের চক্রের পর থেকে ফিফার এই আয় চক্রবৃদ্ধি হারে বেড়েছে। এর আগ্রাসী ধারাবাহিকতায়, ২০২৬ সালের বিশ্বকাপ চক্রে ফিফা রেকর্ড ১৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার রাজস্ব উপার্জনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে।
ফিফার এই পাহাড়সম আয়ের বৃহত্তম উৎস হলো ব্রডকাস্টিং বা সম্প্রচার স্বত্ব (মোট আয়ের প্রায় ৪১%-৫১%)। বিশ্বের বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেল এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের কাছে লাইসেন্স বিক্রির মাধ্যমেই এই বিশাল অর্থ আসে। কেবল ২০২৬ চক্রেই সম্প্রচার স্বত্ব থেকে প্রায় ৪.৩ বিলিয়ন ডলার আয়ের বাজেট করা হয়েছে। দ্বিতীয় বৃহত্তম খাত হিসেবে মার্কেটিং ও স্পনসরশিপ থেকে আসে মোট আয়ের প্রায় ২৫%; যার জোগানদাতা অ্যাডিডাস, কোকা-কোলা, ভিসা এবং হুন্দাইয়ের মতো গ্লোবাল কর্পোরেট জায়ান্ট এবং অফিসিয়াল স্পনসররা। পাশাপাশি স্টেডিয়ামের সাধারণ টিকিট এবং কর্পোরেট ভিআইপি লাউঞ্জের চোখধাঁধানো হসপিটালিটি প্যাকেজ বিক্রি থেকেও বিপুল মুনাফা পকেটস্থ করে ফিফা। ২০২৬ বিশ্বকাপে ৪৮টি দল ও ১০৪টি ম্যাচের বিশাল যজ্ঞ হতে যাওয়ায় কেবল এই টিকিট ও হসপিটালিটি খাত থেকেই ৩ বিলিয়ন ডলার আয়ের সম্ভাবনা রয়েছে। এর বাইরেও ব্র্যান্ড লাইসেন্সিং, ফিফা মিউজিয়াম, জরিমানা ও আপিল ফি এবং তাদের পুঞ্জীভূত ক্যাশ রিজার্ভের বিনিয়োগ থেকে আসা লভ্যাংশ আয়ের আরও বড় কয়েকটি মাধ্যম।
ঊনবিংশ শতাব্দীতে শিল্পবিপ্লবের পর ইংল্যান্ডে আধুনিক ফুটবলের যখন জন্ম হয়, তখন এটি ছিল অবহেলিত শ্রমিক শ্রেণির এক আনন্দমুখর মিলনমেলা। সেই গণমানুষের খেলাকে বিংশ শতাব্দীর শেষভাগে এসে, বিশেষ করে ১৯৯২ সালে ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগ গঠন এবং ফিফার সর্বগ্রাসী অতি-বাণিজ্যিকীকরণের ফলে, পুরোপুরি এক কর্পোরেট পণ্যের মোড়কে বন্দি করা হয়। ফিফার চার বছর মেয়াদি চক্রের ক্রমবর্ধমান রাজস্বের গ্রাফে নজর দিলেই ফুটবলের এই নির্লজ্জ পুঁজিকরণের নগ্ন রূপটি স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে:

এই জ্যামিতিক প্রবৃদ্ধি দ্ব্যর্থহীনভাবে প্রমাণ করে যে, খেলাধুলা এখন আর কেবল মাঠের বিনোদন নয়; বরং এটি নিশ্চিত পুঁজি সঞ্চয়নের একটি অত্যন্ত শক্তিশালী ব্রহ্মাস্ত্র।
সাধারণ মানুষের পক্ষ নিয়ে যেসকল অর্থনীতিবিদ এবং রাজনৈতিক-অর্থনীতি গবেষক ফুটবলকে ব্যবচ্ছেদ করেছেন, তাদের শাণিত বিশ্লেষণ মূলত কার্ল মার্ক্সের ‘পণ্য অপার্থিবতা’ এবং ‘বিচ্ছিন্নতাবোধ’ তত্ত্বের ওপরই দাঁড়িয়ে আছে। ডেভিড কেনেডি (‘ফুটবল ইন নিউ লিবারেল টাইমস’ গ্রন্থের লেখক), ক্রিস ব্যাম্বেরি এবং রিচার্ড জুলিয়ানোত্তির মতো বামপন্থী ক্রীড়া-অর্থনীতিবিদরা এই রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই ফুটবলের আধুনিক বাণিজ্যিক স্বরূপকে উন্মোচন করেছেন। মার্ক্সীয় অর্থনীতির প্রায়োগিক বিশ্লেষণ বলছে—ফুটবলের আদি রূপ নিহিত ছিল এর 'ব্যবহারিক মূল্যে', যেখানে মানুষ স্রেফ শারীরিক সুস্থতা, সামাজিক সংহতি আর নিখাদ আনন্দের তৃষ্ণায় ফুটবল খেলতেন এবং দেখতেন। কিন্তু নব্য-উদারবাদী অর্থনীতি একে চরম আগ্রাসনে স্রেফ ‘বিনিময় মূল্যে’ রূপান্তরিত করেছে। ডেভিড কেনেডি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে দেখিয়েছেন, আধুনিক ফুটবলে গ্যালারির একজন সমর্থক এখন আর কোনো আবেগী "ভক্ত" নন, তিনি পুরোপুরি একজন "ভোক্তা" । টিকিটের আকাশচুম্বী মূল্য, ক্লাবের চড়া দামের জার্সি এবং টিভিতে খেলা দেখার জন্য পে-পার-ভিউ সাবস্ক্রিপশনের চাপ সাধারণ মানুষকে স্টেডিয়াম ও তাদের এই প্রিয় খেলা থেকে নির্মমভাবে দূরে ঠেলে দিচ্ছে।
সমাজ-সচেতন অর্থনীতিবিদরা ফুটবলের চোখধাঁধানো চাকচিক্যের পেছনের অন্ধকার উৎপাদন ব্যবস্থাকেও নির্দয়ভাবে সামনে এনেছেন। ক্রীড়া অর্থনীতিবিদ ডেভিড কেনেডি ২০২২ সালের এক গবেষণায় উন্মোচন করেছেন কীভাবে বিশ্বকাপের অফিসিয়াল বল বা জার্সি পাকিস্তানের শিয়ালকোট বা এশিয়ার অন্যান্য স্বল্পোন্নত অঞ্চলের কারখানায় নামমাত্র মজুরিতে, প্রায় দাসত্বসুলভ পরিবেশে ঘর্মাক্ত শ্রমিকদের দিয়ে তৈরি করানো হয়। অথচ, সেই একই বল বা জার্সি যখন উন্নত বিশ্বে "প্রযুক্তি ও আভিজাত্যের প্রতীক" হিসেবে বিক্রি হয়, তখন তার মুনাফা ফুলেফেঁপে চলে যায় ফিফা এবং বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর পকেটে। মার্ক্সীয় ভাষায় একেই বলা হয় ‘কমোডিটি ফেটিশিজম’—যেখানে একটি মসৃণ পণ্যের জৌলুস অত্যন্ত নিপুণভাবে তার পেছনের উৎপাদক শ্রমিকের রক্তক্ষরণ ও শোষণকে আড়াল করে দেয়।
সমাজবিজ্ঞানী ও অর্থনীতিবিদদের স্পষ্ট অভিমত, ফিফা এবং বৃহৎ ক্লাবগুলোর নীতিনির্ধারকরা আজ ফুটবলের মূল অন্তর্নিহিত চেতনা থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন। ফিফা কাগজে-কলমে নিজেদের অলাভজনক সংস্থা বলে দাবি করলেও এর চূড়ান্ত ও একমাত্র লক্ষ্য পুঁজির সীমাহীন সঞ্চয়ন। কাতার বা অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশে বিশ্বকাপ আয়োজনের মেগা যজ্ঞে হাজার হাজার অভিবাসী শ্রমিকের মানবাগার ক্ষুণ্ণ হওয়ার পরও যখন ফিফার কোটি কোটি ডলারের করমুক্ত মুনাফা নিশ্চিত করা হয়, অর্থনীতিবিদরা তাকে পুঁজিবাদের এক নির্মম ও বীভৎস বহিঃপ্রকাশ হিসেবেই আখ্যা দেন। এই শোষণের বিশ্লেষণে আরেকটি ভয়াবহ দিক উঠে আসে—বিশ্বকাপ আয়োজনের সমস্ত আকাশকুসুম অবকাঠামোগত খরচ এবং ঝুঁকি নির্দয়ভাবে চাপিয়ে দেওয়া হয় স্বাগতিক দেশের ঘাড়ে, অথচ সিংহভাগ করমুক্ত মুনাফা বিনা বাধায় পাচার হয়ে যায় ফিফার তহবিলে। ২০১০ সালে দক্ষিণ আফ্রিকা, ২০১৪ সালে ব্রাজিল এবং ২০১৮ সালে রাশিয়া বিশ্বকাপের জন্য সাধারণ মানুষের করের টাকায় বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার খরচ করে যেসব বিলাসবহুল স্টেডিয়াম বানিয়েছিল, সেগুলো আজ পুরোপুরি পরিত্যক্ত বা "শ্বেতহস্তী" তে পরিণত হয়েছে, যা স্বাগতিক দেশগুলোর আপামর জনগণকে ঋণের এক অতল সাগরে ডুবিয়ে ছেড়েছে।
ফিফার আধুনিক রেভিনিউ মডেল এবং ফুটবলের এই নগ্ন বাণিজ্যিক রূপান্তর এক নির্মম সত্যকে প্রমাণ করে—ধনতান্ত্রিক অর্থনীতি মানব সংস্কৃতির সবচেয়ে স্বতঃস্ফূর্ত ও জনপ্রিয় উপাদানটিকেও আজ নিজের পকেটে পুরে ফেলেছে। অর্থনীতিবিদদের বয়ানে, ফুটবল আজ আর সেই খেটে খাওয়া শ্রমিক শ্রেণির মুক্ত প্রাণের খেলা নেই; এটি আজ পরিণত হয়েছে কর্পোরেট পুঁজিবাদের এমন এক ধুরন্ধর ‘বিনোদন সার্কাস’-এ, যার মূল উদ্দেশ্য হলো সাধারণ মানুষের আবেগ ও শ্রমকে পুঁজিতে রূপান্তর করে গুটিকয়েক আন্তর্জাতিক ধনকুবের এবং সংস্থার ব্যাংক ব্যালেন্স স্ফীত করা।
--
*লেখক: নির্বাহী সম্পাদক, ঢাকা পেপারস।
ইমেইল: [email protected]



