সিটি গ্রুপের আর্থিক সংকট ও বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের খেলাপি বাস্তবতা: একটি পর্যালোচনা


সিটি গ্রুপের আর্থিক সংকট ও বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের খেলাপি বাস্তবতা: একটি পর্যালোচনা
সিটি গ্রুপের এই ঋণের শর্ত পুনর্গঠনের মরিয়া চেষ্টা মূলত বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের সামগ্রিক ক্যানসারের একটি ক্ষুদ্র বহিঃপ্রকাশ মাত্র। বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত দীর্ঘদিন ধরেই ভঙ্গুর অবস্থায় রয়েছে, তবে খেলাপি ঋণের এই প্রকোপ নজিরবিহীন রূপ নেয় বিগত শেখ হাসিনা সরকারের আমলে। রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব, রাষ্ট্রীয় তদারকি সংস্থাগুলোর অকার্যকারিতা এবং কিছু গোষ্ঠীর হাতে সমস্ত অর্থনীতির দখল বা স্বজনতোষী পুঁজিবাদ এই সংকটকে জ্যামিতিক হারে বাড়িয়ে দিয়েছে।
১৯৭২ সালে ব্যবসায়ী ফজলুর রহমানের হাত ধরে ক্ষুদ্র পরিসরে যে প্রতিষ্ঠানের যাত্রা শুরু হয়েছিল, তা সময়ের পরিক্রমায় গড়ে ওঠে দেশের অন্যতম বৃহত্তম কনগ্লোমারেট হিসেবে। বাংলাদেশের ভোগ্যপণ্য ও শিল্প খাতের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় বৃহৎ করপোরেট প্রতিষ্ঠান সিটি গ্রুপ বর্তমানে তাদের ৫৪ বছরের ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ আর্থিক সংকটের মুখোমুখি হয়েছে। তীর, ন্যাচারাল, জীবন, সান-এর মতো জনপ্রিয় ব্র্যান্ডের মাধ্যমে দেশের চিনি সরবরাহের প্রায় ৪০%, ভোজ্যতেলের ৩৫% এবং গমের চাহিদার ২৫% একাই নিয়ন্ত্রণ করে এই শিল্পগোষ্ঠী।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে দেশের ৩৬টি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে নেওয়া প্রায় ২৬,৬০০ কোটি টাকার ঋণ পুনর্গঠন বা রিশিডিউল করার নজিরবিহীন আবেদন গ্রুপটির অভ্যন্তরীণ তারল্য সংকট এবং ব্যবসায়িক অস্থিতিশীলতা কে প্রকাশ্যে এনেছে।
সিটি গ্রুপের আর্থিক সংকটের নেপথ্যে: ব্যবসায়িক কৌশল বনাম কাঠামোগত অনিয়ম
দীর্ঘ ৫ দশকেরও বেশি সময় ধরে বাজারে সফলভাবে ব্যবসা পরিচালনা করার পর সিটি গ্রুপ কেন এমন প্রতিকূল অবস্থায় পড়ল, তা নিয়ে দেশের অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংকিং বিশেষজ্ঞদের মধ্যে নানামুখী বিশ্লেষণ চলছে। সিনিয়র ব্যাংকারদের মতে, এই সংকটের পেছনে যেমন বৈশ্বিক ও দেশীয় সামষ্টিক অর্থনৈতিক ধাক্কা রয়েছে, তেমনই রয়েছে কিছু আগ্রাসী ও ত্রুটিপূর্ণ ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত।
১. আগ্রাসী ব্যবসায়িক সম্প্রসারণ ও দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ: ২০২০ সালের পর থেকে সিটি গ্রুপ প্রায় ১৪,০০০ কোটি টাকা ব্যয়ে ছয়টি বড় শিল্প প্রকল্পে হাত দেয়, যার সিংহভাগই ছিল ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু তীব্র গ্যাস ও জ্বালানি সংকটের কারণে এসব প্রকল্প সময়মতো উৎপাদনে যেতে পারেনি, ফলে বিনিয়োগকৃত অর্থ থেকে কোনো রেভিনিউ বা ক্যাশ-ফ্লো আসেনি।
২. টাকার অবমূল্যায়ন ও ডলারের সংকট: গত দুই বছরে মার্কিন ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়নের কারণে কাঁচামাল আমদানির খরচ জ্যামিতিক হারে বেড়েছে। এলসি খোলা এবং আন্তর্জাতিক ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে কনফার্মেশন পাওয়ার ক্ষেত্রে গ্রুপটি তীব্র তারল্য সংকটে পড়ে।
৩. প্রতিষ্ঠাতার প্রয়াণ ও নেতৃত্বের শূন্যতা: গ্রুপের প্রধান উদ্যোক্তা ও চেয়ারম্যান ফজলুর রহমানের প্রয়াণের পর করপোরেট সুশাসন ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় এক ধরনের সমন্বয়হীনতা তৈরি হয় বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।
অর্থ অনিয়ম ও খাতের ভিন্নতা নিয়ে প্রশ্ন
অনেক স্বাধীন অর্থনৈতিক বিশ্লেষক এবং ব্যাংকিং খাতের অডিটররা ইঙ্গিত করেছেন যে, গ্রুপটি “ওভার অ্যান্ড আন্ডার ইনভয়েসিং”-এর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের আড়ালে মূলধন সরানো বা অর্থ পাচার করেছে কি না, তা খতিয়ে দেখা দরকার। এছাড়া, ব্যাংকিং খাতের প্রচলিত নিয়ম লঙ্ঘন করে ব্যাংক থেকে নির্দিষ্ট একটি ব্যবসার নামে (যেমন ভোজ্যতেল বা গমের কাঁচামাল আমদানি) সংগৃহীত ঋণ সেই খাতে ব্যবহার না করে অন্য কোনো অনুৎপাদনশীল খাতে বা মেগা প্রকল্পের জমি কেনায় ব্যবহার করা হয়েছে, যা এই আর্থিক বিপর্যয়কে ত্বরান্বিত করেছে। ব্যাংকগুলোর পরিচালনা পর্ষদ ও রাজনৈতিক প্রভাবশালী মহলকে ব্যবহার করে আইনি সীমার অতিরিক্ত ঋণ সুবিধা গ্রহণ করা হয়েছে, যা পরবর্তীতে সমন্বয় করা সম্ভব হয়নি।
মাল্টি-ডাইমেনশনাল চেইন রিঅ্যাকশন: কর্মী, ব্যাংক এবং আমানতকারীদের ঝুঁকি
সিটি গ্রুপের এই ভয়াবহ আর্থিক ধাক্কা কেবল প্রতিষ্ঠানটির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং এটি দেশের অর্থনীতিতে একটি বহুমুখী সংকট বা চেইন রিঅ্যাকশন তৈরি করেছে:
• কর্মসংস্থান হ্রাস ও চাকরির শঙ্কা: প্রায় ২৫,০০০ প্রত্যক্ষ কর্মী এবং পরোক্ষভাবে যুক্ত লাখো মানুষের জীবিকা এখন চরম হুমকির মুখে। আর্থিক সক্ষমতা পুনরুদ্ধারে গ্রুপটি ইতিমধ্যেই কিছু অ-কোর ব্যবসা বা সম্পদ বিক্রির চিন্তাভাবনা করছে, যা কর্মী ছাঁটাইয়ের আতঙ্ককে বাড়িয়ে দিয়েছে।
• ব্যাংকিং খাতের ওপর সিস্টেমিক রিস্ক: যদি ২৬,৬০০ কোটি টাকার এই বিশাল ঋণ শেষ পর্যন্ত খেলাপি হয়ে যায়, তবে ঋণদাতা ৩৬টি ব্যাংকের খেলাপি ঋণের অনুপাত এক ধাক্কায় অনেক বেড়ে যাবে। এর ফলে ব্যাংকগুলোকে বিপুল পরিমাণ ‘প্রভিশনিং’ বা নিরাপত্তা সঞ্চিতি রাখতে হবে, যা ব্যাংকের মুনাফা করার ক্ষমতা ও ঋণ দেওয়ার সক্ষমতাকে বাধাগ্রস্থ করবে।
• আমানতকারীদের আস্থার সংকট: ব্যাংকগুলোর তারল্য সংকট এবং বড় করপোরেট ঋণের অনিয়ম সাধারণ আমানতকারীদের মনে এক ধরণের হতাশার জন্ম দিয়েছে, যা পুরো দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপর আমানতকারীদের আস্থাকে নারিয়ে দিতে পারে।
বাংলাদেশ ব্যাংকিং খাতের বিপর্যয়: শেখ হাসিনা আমলের লিগ্যাসি ও বর্তমান বাস্তবতা
সিটি গ্রুপের এই ঋণ পুনর্গঠনের মরিয়া চেষ্টা মূলত বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের সামগ্রিক ক্যানসারের একটি ক্ষুদ্রতম বহিঃপ্রকাশ মাত্র। বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত দীর্ঘদিন ধরেই ভঙ্গুর অবস্থায় রয়েছে, তবে খেলাপি ঋণের এই প্রকোপ নজিরবিহীন রূপ নেয় বিগত শেখ হাসিনা সরকারের আমলে। রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব, নিয়ন্ত্রক সংস্থার অকার্যকারিতা এবং "ক্রোনি ক্যাপিটালিজম" বা স্বজনতোষি পুঁজিবাদ এই সংকটকে জ্যামিতিক হারে বাড়িয়ে দিয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ হালনাগাদকৃত ডাটা অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুন শেষে দেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে রেকর্ড ৬,০৬,৫৫৫ কোটি টাকা। এটি দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ এবং মোট বিতরণকৃত ঋণের রেকর্ড ৩২.৭৮ শতাংশ। অর্থাৎ, ব্যাংকগুলোর দেওয়া প্রতি ১০০ টাকার ঋণের মধ্যে প্রায় ৩৩ টাকাই এখন খেলাপি বা আদায় অযোগ্য। এর মধ্যে মাত্র ১০টি ব্যাংকের কাছেই রয়েছে মোট খেলাপি ঋণের ৭২ শতাংশের বেশি অর্থ।
বাংলাদেশের এই ভঙ্গুর ব্যাংকিং পরিস্থিতি এবং বড় করপোরেট ঋণ বিপর্যয় নিয়ে অর্থনীতিবিদরা তীব্র উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট (BIBM) এর সাবেক মহাপরিচালক ড. তৌফিক আহমদ চৌধুরী বলেছেন, "একটি মাত্র করপোরেট গ্রুপের কাছে ব্যাংকগুলোর ঋণ প্রদানের যে আগ্রাসী কেন্দ্রীভবন দেখা গেছে, তা ব্যাংকিং খাতের নিয়মতান্ত্রিক ঝুঁকি মূল্যায়নের চরম ব্যর্থতা।
অনেক নামী ব্যাংক কেবল সিটি গ্রুপের সুনামের ওপর ভিত্তি করে হাজার হাজার কোটি টাকা দিয়েছে, কোনো কার্যকর ঝুঁকি বিশ্লেষণ ছাড়াই।" অর্থনীতিবিদ ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য ধারাবাহিকভাবে উল্লেখ করেছেন যে, ব্যাংকিং খাত মূলত রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের অনিয়মের চারণভূমিতে পরিণত হয়েছিল। আইনি ফাঁকফোকর এবং রাজনৈতিক আশ্রয়ে অর্থ পাচার ও ব্যাংক দখলের যে সংস্কৃতি তৈরি হয়েছিল, তার খেসারত দিতে হচ্ছে এখনকার অর্থনীতিকে।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল এবং বিশ্বব্যাংকের সাবেক অর্থনীতিবিদদের মতে, বাংলাদেশে সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো “রেগুলেটরী ক্যাপচার” (Regulatory Capture)—অর্থাৎ নিয়ন্ত্রক সংস্থা নিজেই নিয়ন্ত্রিতদের প্রভাবে পরিচালিত হওয়া। বিশ্বব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন ও আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, যতক্ষণ না পর্যন্ত ব্যাংকিং খাতে স্বতন্ত্র ফরেনসিক অডিট চালানো হবে এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত হয়ে খেলাপিদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার নজির তৈরি করা হবে, ততক্ষণ পর্যন্ত কোনো প্যাকেজ দিয়ে এই খাতকে রক্ষা করা যাবে না।
সিটি গ্রুপের মতো বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠীর আর্থিক বিপর্যয় কেবল একটি একক প্রতিষ্ঠানের পতন নয়, বরং এটি বাংলাদেশের পুরো আর্থিক ও ব্যাংকিং খাতের সুশাসনের চরম দূরবস্থার এক স্পষ্ট প্রতিফলন। ব্যাংকিং খাতকে বিপর্যয় থেকে বাঁচাতে হলে দ্রুত ব্যাংকগুলোর ব্যালেন্স শিট পুনর্গঠন, সিটি গ্রুপের মূল উৎপাদনশীল অংশগুলোকে অহেতুক দেউলিয়া হওয়া থেকে রক্ষা করে সচল রাখা এবং কর্মসংস্থান রক্ষার একটি বাস্তবসম্মত রোডম্যাপ তৈরি করা অপরিহার্য। একই সাথে, রাজনৈতিক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে ব্যাংক থেকে অনিয়মতান্ত্রিকভাবে বের করে নেওয়া টাকার নিরপেক্ষ তদন্ত ও আইনি ব্যবস্থা গ্রহণই পারে দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে।
-- --
লেখক: নির্বাহী সম্পাদক, ঢাকা পেপারস।



