৯ লাখ কোটি টাকার বাজেট টার্গেট: মধ্যবিত্ত ও গরিবের পকেট কাটার নকশা


কার্টুনঃ এআই
ব্যবসায়ীদের জন্য বাজেট টার্গেটে হরেক রকমের কর ছাড় আর প্রণোদনার ব্যবস্থা আছে। আর আমজনতার জন্য করুণা হিসেবে করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানো হয়েছে মাত্র পঁচিশ হাজার টাকা। আজকের দিনের বাজারে ২৫ হাজার টাকার কোনো কানাকড়ি মূল্য নেই। বাজার আগুন। মানুষের সঞ্চয় শেষ। এমন পরিস্থিতিতে প্রত্যক্ষ করের আওতা না বাড়িয়ে মানুষের পকেট কাটার এই প্রাক্কলন স্রেফ নিষ্ঠুরতা। এনবিআরের সাবেক হর্তাকর্তারাও স্বীকার করছেন, যতক্ষণ বড় মাছিদের ধরা না যাচ্ছে, ততক্ষণ এই বাজেট হবে মধ্যবিত্তের মরণফাঁদ।
৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বিশাল বাজেটের স্বপ্ন দেখানো হচ্ছে। বিশাল সব সংখ্যা, আর তার আড়ালে সাধারণ মানুষের পকেট কাটার এক নিপুণ ছক। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের মাধ্যমে কর আদায়ের লক্ষ্য ধরা হয়েছে ৬ লাখ কোটি টাকার উপরে। শুনলে মনে হবে দেশ রাজকীয় পথে হাঁটছে। আসলে এই টাকার সিংহভাগই আসবে ভ্যাট আর শুল্ক থেকে। অর্থাৎ সরাসরি মানুষের ভাতের থালায় থাবা। বাজেট টার্গেটের নামে আসলে এক ধরনের রাষ্ট্রীয় ডাকাতির বন্দোবস্ত করা হয়েছে।
পরিসংখ্যান বলছে, প্রত্যক্ষ করের লক্ষ্যমাত্রা মাত্র ৩৬ শতাংশ। বাকি বিশাল বোঝাটাই পরোক্ষ করের। এর মানে পরিষ্কার—ধনীদের গায়ে আঁচড় পড়বে না। চাল, ডাল আর লবণের ওপর যে কর বসবে, তা দিতে হবে খেটে খাওয়া মানুষকে। একজন পোশাক শ্রমিক আর একজন আমদানিকারক—দুজনেই একই হারে ভ্যাট দিচ্ছেন। এই বৈষম্যকেই কি তবে 'উন্নয়ন' বলা হচ্ছে? করের এই লক্ষ্যমাত্রা কোনোভাবেই জনবান্ধব নয়, বরং জননিপীড়ক। অর্থনীতিবিদদের স্রেফ ড্রয়িংরুমের আলোচনা না, এটা এখন জীবন-মরণের প্রশ্ন। কারণ ৩.৮৪ লাখ কোটি টাকার পরোক্ষ করের বড় অংশটাই যাবে মধ্যবিত্ত আর নিম্নবিত্তের ঘাম মোছানো টাকা থেকে।
ধনীদের তোষণ ও মধ্যবিত্তের বলীদান
সরকারের কর কাঠামোর টার্গেটটাই উল্টো। যাকে অর্থনীতিতে বলা হয় রিগ্রেসিভ পদ্ধতি। অর্থাৎ গরিবের রক্ত চোষা হবে বেশি, ধনীদের সুবিধা দেওয়া হবে কানায় কানায়। সিপিডির তথ্য দেখলে চক্ষু চড়কগাছ হয়। যারা বছরে ৬ থেকে ১৫ লাখ টাকা আয় করেন, তাদের ওপর করের বোঝা বাড়ানো হয়েছে সাড়ে ১২ থেকে ১৬ শতাংশ পর্যন্ত। অথচ এর দ্বিগুণ-তিনগুণ কামাই করা রাঘববোয়ালদের করের ভার বাড়ানো হয়েছে মোটে ৭ শতাংশের মতো। এর নাম কি ইনসাফ? না, এটা সরাসরি তোষামোদ।
ব্যবসায়ীদের জন্য বাজেট টার্গেটে হরেক রকমের কর ছাড় আর প্রণোদনার ব্যবস্থা আছে। আর আমজনতার জন্য করুণা হিসেবে করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানো হয়েছে মাত্র পঁচিশ হাজার টাকা। আজকের দিনের বাজারে ২৫ হাজার টাকার কোনো কানাকড়ি মূল্য নেই। বাজার আগুন। মানুষের সঞ্চয় শেষ। এমন পরিস্থিতিতে প্রত্যক্ষ করের আওতা না বাড়িয়ে মানুষের পকেট কাটার এই প্রাক্কলন স্রেফ নিষ্ঠুরতা। এনবিআরের সাবেক হর্তাকর্তারাও স্বীকার করছেন, যতক্ষণ বড় মাছিদের ধরা না যাচ্ছে, ততক্ষণ এই বাজেট হবে মধ্যবিত্তের মরণফাঁদ।
সঞ্চয়পত্রে থাবা আর আইএমএফের চাবুক
সরকার কেন এই আত্মঘাতী টার্গেট ঠিক করেছে? উত্তরটা সোজা। আইএমএফের ঋণের কিস্তি মেলাতে হবে। তাদের শর্ত মেনে কর-জিডিপি অনুপাত রাতারাতি বাড়িয়ে ৯ শতাংশে নিতে চায় সরকার।এই খেসারত দিতে হচ্ছে দেশের নিরাপদ বিনিয়োগ সঞ্চয়পত্রকে।
মানুষের বিপদের দিনের এই আশ্রয়স্থলকে নিয়ে খেলা হচ্ছে নির্মম জুয়া। সঞ্চয়পত্রের বিনিয়োগ রেয়াত কমিয়ে সাড়ে ৭ লাখে নামানো হয়েছে। এতে সাধারণ মানুষ তার সঞ্চয়টুকু ভাঙিয়ে খেতে বাধ্য হবে।
বাজারে মূল্যস্ফীতির দাপট কমছে না। ৭.৫ শতাংশের যে কাল্পনিক লক্ষ্যমাত্রা বাজেটে দেওয়া হয়েছে, তার সাথে বাস্তবের কোনো মিল নেই। বাজারে গেলে মানুষ হিসাব মেলাতে পারে না। আইএমএফের পা চাটতে গিয়ে মধ্যবিত্ত আর শ্রমজীবী মানুষকে দেউলিয়া করার পথে হাঁটছে এই বাজেট পরিকল্পনা। লক্ষ্যমাত্রা যখন মানবিক না হয়ে স্রেফ সংখ্যার অংকে আটকে যায়, তখন তাকে বাজেট না বলে লুটেরাদের সনদ বলাই শ্রেয়। প্রত্যক্ষ কর বাড়ানোর সৎ সাহস সরকারের নেই, তাই চাবুকটা সবসময় ঘুরছে সাধারণের পিঠের ওপরেই। এ এক নিষ্ঠুর প্রহসন।
-- --
লেখক: নির্বাহী সম্পাদক, ঢাকা পেপারস।



