সভ্যতার পূর্বমুখী যাত্রা: অর্থনীতি, জ্ঞান-বিজ্ঞান ও সমরশক্তির নতুন ভরকেন্দ্র


বেইজিং, উইকি
পরিসংখ্যান পরিষ্কার বলছে—পশ্চিমা বিশ্ব আজ কেবলই ভোক্তা, আর প্রকৃত উৎপাদক, উদ্ভাবক ও উদ্ভাবনের ল্যাবরেটরি এখন এশিয়া ও গ্লোবাল সাউথের দেশগুলো।
দুনিয়ার অর্থনৈতিক মেরু পরিবর্তন এবং বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতিতে এখন নতুন খেলোয়াড়দের প্রবল উপস্থিতি। শত শত বছর ধরে চলা পশ্চিমা আধিপত্যের পতন এবং এশিয়ার অভাবনীয় উত্থান কেবল অর্থনীতির বইয়ে সীমাবদ্ধ নেই। এটি এখন মানবসভ্যতার গতিপথই বদলে দিচ্ছে।
সেই দিন আর দূরে নয়, যখন জ্ঞান অর্জন, উচ্চশিক্ষা বা গবেষণার জন্য মানুষকে আর পশ্চিমের দেশগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকতে হবে না। শত বছর ধরে মানুষ ইউরোপ-আমেরিকাকে ‘জ্ঞানের তীর্থস্থান’ বলে মেনে আসলেও, খুব শিগগিরই সারা দুনিয়ার মেধাবীরা প্রাচ্যের দেশগুলোর দিকে ছুটবে। আগামী বিশ্বে জ্ঞান অর্জন এবং যুগান্তকারী গবেষণার জন্য শেষ পর্যন্ত চীন, ভারত বা দূরপ্রাচ্যেই যেতে হবে।
মালয়েশিয়ার মতো উন্নত কাঠামোর পাশাপাশি আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই ভিয়েতনাম কিংবা ইন্দোনেশিয়ায় বৈশ্বিক উচ্চ-দক্ষতাসম্পন্ন পেশাদার ও গবেষকরা স্থায়ীভাবে যাওয়া শুরু করবেন। পশ্চিমা বিশ্ব, বিশেষ করে ইউরোপ যখন তাদের স্থবির অর্থনীতি ও বয়স্ক জনসংখ্যার সংকটে নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে অভিবাসন ও ভিসার শর্ত অতিমাত্রায় শিথিল করবে, তখনো হয়তো তারা সেখানে বসবাস করার জন্য কাঙ্ক্ষিত মেধাবী মানুষ খুঁজে পাবে না। আমেরিকারও এমন পরিণতির মুখোমুখি হতে খুব বেশি দেরি নেই। একসময় যে তুরস্ক ‘ইউরোপের দেশ’ হওয়ার স্বপ্নে বিভোর ছিল, তারা হয়তো অচিরেই এশিয়ার অংশ হিসেবে নিজেদের ব্র্যান্ড পরিচয় তৈরি করতেই বেশি গর্ববোধ করবে। আফ্রিকা থেকে অতি-দরিদ্র পরিচিতির খোলস ভেঙে অভাবনীয় গতিতে উঠে আসছে নাইজেরিয়ার মতো সম্পদ-সমৃদ্ধ দেশগুলো।
ইতিহাসের একটি সাধারণ নিয়ম হলো—অর্থনীতি যেখানে যায়, জ্ঞান, বিজ্ঞান ও সমরশক্তি ঠিক তাকেই অনুসরণ করে। এই পরিবর্তনটিকে গভীরভাবে অনুধাবন করতে হলে বিশ্বের প্রকৃত জিডিপিতে কার কত অবদান, সেদিকে তাকাতে হবে।
বিশ্ব অর্থনীতির চালিকাশক্তি ও সামরিক-বৈজ্ঞানিক ক্ষমতার সমীকরণ
প্রকৃত জিডিপির অবদান কেবল একটি অর্থনৈতিক সূচক নয়। এটি হলো বিশ্বে আগামী দিনে কারা গবেষণাগার নিয়ন্ত্রণ করবে এবং কার নৌবহর সাগরে আধিপত্য বিস্তার করবে, তার সবচেয়ে বড় মাপকাঠি। এখানে প্রকৃত প্রবৃদ্ধি বলতে মূল্যস্ফীতি বাদ দিয়ে উৎপাদিত প্রকৃত পণ্য ও সেবার হিসাবকে বোঝায়। বিস্ময়কর হলেও সত্যি, বর্তমানে বিশ্বের মোট প্রকৃত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রায় অর্ধেকই আসছে মাত্র দুটি দেশ—চীন ও ভারত থেকে।
চীনের অবদান ২৬.৬ শতাংশ
চীন একাই বৈশ্বিক প্রকৃত প্রবৃদ্ধির ২৬.৬ শতাংশের জোগান দিচ্ছে। বিগত চার দশক ধরে রপ্তানিমুখী শিল্পায়ন করে আসা চীন এখন আর সস্তা পণ্যের দেশ নয়। তারা কোয়ান্টাম কম্পিউটিং, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সবুজ জ্বালানি এবং মহাকাশ বিজ্ঞানে আমেরিকাকেও পাল্লা দিয়ে পেছনে ফেলে দিচ্ছে। অর্থনীতির এই বিশাল ভিত্তি ব্যবহার করে তারা পৃথিবীর সর্ববৃহৎ নৌবাহিনী এবং হাইপারসনিক মিসাইলের মতো পরাশক্তি-সুলভ সামরিক প্রযুক্তি গড়ে তুলেছে। আজ উন্নত দুনিয়ার বড় বড় মেধাবীরা গবেষণা অনুদান এবং সর্বাধুনিক ল্যাবের সুবিধার্থে অক্সফোর্ড বা হার্ভার্ডের চেয়ে পিকিং বা সিংহুয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে ঝুঁকছেন।
ভারতের অবদান ১৭ শতাংশ
তালিকার দ্বিতীয় স্থানে থাকা ভারত অবদান রাখছে ১৭ শতাংশ। ভারতের এই প্রবৃদ্ধির প্রধান জ্বালানি হলো তাদের সুবিশাল তরুণ জনশক্তি এবং অভ্যন্তরীণ বিশাল বাজার। ভারতের তথ্যপ্রযুক্তি ও সেবা খাত বিশ্বের প্রযুক্তি কেন্দ্রগুলোকে পরিচালিত করছে। অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির কারণে তারা এখন চন্দ্রযানের মতো সফল মহাকাশ অভিযান চালাচ্ছে। এর পাশাপাশি প্রতিরক্ষা উৎপাদনের দিকে নজর দিয়ে তারা বিশাল সামরিক শিল্প গড়ে তুলেছে। ভারতের এই বিজ্ঞানমুখী উল্লম্ফন প্রমাণ করছে, দক্ষিণ এশিয়ার মেধা এখন আর পশ্চিমা দেশগুলোতে চলে যাচ্ছে না, বরং তারা নিজ ভূমিতেই গবেষণা ও উন্নয়নের ভিত্তি গড়ছে।
ইন্দোনেশিয়া ও ভিয়েতনামও এই বলয়ে গুরুত্ব রাখবে
এই পরিবর্তনে কেবল চীন ও ভারত নয়, নতুন সুপারপাওয়ার হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে ইন্দোনেশিয়া ও ভিয়েতনাম। বৈশ্বিক জিডিপিতে ৩.৮ শতাংশ অবদান রাখা ইন্দোনেশিয়া তার তরুণ জনগোষ্ঠী এবং নিকেলের মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদ কাজে লাগিয়ে বিশ্বব্যাপী ইলেকট্রিক গাড়ির ব্যাটারি সরবরাহ শৃঙ্খল নিজেদের আয়ত্তে আনছে। কাঁচামাল বিক্রি বন্ধ করে দিয়ে দেশেই উচ্চ-প্রযুক্তির কারখানায় বিনিয়োগ বাধ্য করায় তারা প্রযুক্তিতে অভাবনীয় উল্লম্ফন করেছে।
অন্যদিকে, ১.৬ শতাংশ অবদান রাখা ভিয়েতনাম এখন শুধু কম খরচের উৎপাদক নয়। চিপ তৈরি এবং উন্নত ইলেকট্রনিক্স উৎপাদনে তারা এখন বৈশ্বিক কেন্দ্র। বিশ্বখ্যাত প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো যখন সেখানে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করছে, তখন সেখানকার সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয়গুলো রূপ নিচ্ছে ছোট ছোট প্রযুক্তি কেন্দ্রে। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে এই দুটি দেশই সমুদ্রসীমা রক্ষায় অত্যাধুনিক সামরিক জোট ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা বলয় তৈরি করছে।
এর বাইরে তুরস্ক (২.২ শতাংশ) ড্রোনের মতো আধুনিক সমর-প্রযুক্তি রপ্তানি এবং উৎপাদন খাত সচল রেখে জিডিপিতে ভূমিকা রাখছে। মধ্যপ্রাচ্যের একচেটিয়া তেলের ভাবমূর্তি ভেঙে সৌদি আরব (১.৭ শতাংশ) তাদের দূরদর্শী পরিকল্পনা দিয়ে নিজেদের প্রযুক্তি কেন্দ্র ও পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করছে। কৃষি ও সম্পদের বিস্তৃতি নিয়ে নাইজেরিয়া (১.৫%) ও ব্রাজিল (১.৫%) নতুন শক্তির জানান দিচ্ছে।
অন্যদিকে, প্রকৃত প্রবৃদ্ধির মাত্র ৯.৯ শতাংশ অবদান রাখা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র উদ্ভাবনী শক্তিতে টিকতে পারলেও নিজেদের তৈরি প্রযুক্তি ও উৎপাদনের কাঁচামালের জন্য এশিয়ার ওপর অতি-নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। আর ইউরোপের অন্যতম ইঞ্জিন জার্মানি (০.৯ শতাংশ) এখন তীব্র জ্বালানি ও প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি।
প্রতিষ্ঠান ও ক্ষমতার স্থাপত্যে ভাঙা-গড়া
এই পরিসংখ্যান পরিষ্কার বলছে—পশ্চিমা বিশ্ব আজ কেবলই ভোক্তা, আর প্রকৃত উৎপাদক, উদ্ভাবক ও উদ্ভাবনের ল্যাবরেটরি এখন এশিয়া ও গ্লোবাল সাউথের দেশগুলো। মানব ইতিহাস প্রমাণ করে, যে অঞ্চল বিশ্ব অর্থনীতির চালিকাশক্তি, জ্ঞান এবং পেশীশক্তির কলকাঠি তাদের হাতেই থাকে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যে সামরিক শক্তি ও প্রবৃদ্ধির ওপর ভিত্তি করে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ, বিশ্বব্যাংক বা আইএমএফ তৈরি হয়েছিল, আজ পশ্চিমা বিশ্বের সেই আধিপত্য প্রশ্নবিদ্ধ। চীন-নেতৃত্বাধীন এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক প্রতিষ্ঠা কিংবা ব্রিকসের অভূতপূর্ব সম্প্রসারণ প্রমাণ করে গ্লোবাল সাউথ আর পশ্চিমা মডেলের আশায় বসে নেই। সামরিক ও প্রযুক্তিগতভাবে বলীয়ান এশিয়া আজ বলতে শুরু করেছে—‘আমাদের ছাড়া বৈশ্বিক নীতির এজেন্ডা ঠিক হবে না।’
জোটবিহীনতা ২.০ এবং ডলারের পতন
গ্লোবাল সাউথের দেশগুলোর নিজেদের অর্থনীতির জোর থাকায় তারা ‘কৌশলগত স্বাধীনতা’ ভোগ করছে। ভিয়েতনামের ‘বাঁশ কূটনীতি’ কিংবা পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে ভারতের স্বাধীন তেল-বাণিজ্য—এই সবই প্রমাণ করে পশ্চিমারা আজ কাউকে ব্ল্যাকমেইল করতে সক্ষম নয়। সরবরাহ শৃঙ্খল ও উচ্চ প্রযুক্তিতে পিছিয়ে পড়তে থাকা আমেরিকা বাধ্য হয়ে এখন ‘জাতীয় অর্থনৈতিক নিরাপত্তার’ দোহাই দিয়ে সেমিকন্ডাক্টর নীতি করছে। অন্যদিকে সামরিক শক্তি ও বিজ্ঞান গবেষণার কেন্দ্রে উঠে আসা এশিয়ান পরাশক্তিগুলো নিজেদের স্থানীয় মুদ্রায় লেনদেন শুরু করেছে। রাশিয়া, চীন, সৌদি বা ব্রাজিলের নিজেদের মুদ্রায় এই বাণিজ্যিক ঐক্যবদ্ধতা শুধু ডলারকে চ্যালেঞ্জ করছে না, বরং পশ্চিমা সভ্যতার একচেটিয়া ক্ষমতাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
নতুন সভ্যতার গন্তব্য ও বাংলাদেশের পাঠ
এশিয়া ও গ্লোবাল সাউথের এই একীভূত হয়ে ওঠার বিষয়টি কেবল একটি সাময়িক চক্র নয়; এটি মানব ইতিহাসের দীর্ঘ যাত্রার এক মৌলিক ও স্থায়ী প্রত্যাবর্তন। এক শতাব্দীর বিরতির পর বিশ্বের অর্থনীতি, শিল্পায়ন, মহাকাশ বিজ্ঞান এবং সামরিক ভরকেন্দ্র আবারো চিরচেনা পূর্বমুখী যাত্রা সম্পন্ন করছে। বিশ্ব রাজনীতি আজ বহুমুখী হয়ে গেছে, যেখানে একক মোড়লগিরি চালানোর দিন শেষ।
জ্ঞানের এই নতুন বিশ্বে পশ্চিমা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জায়গা দখল করছে এশীয় একাডেমিয়া। পশ্চিমা ড্রোন ও মিসাইলের বদলে দুনিয়ার বাজার দখল করছে পূর্ব ও দক্ষিণের প্রযুক্তি। এই বৈশ্বিক জিডিপির মহাসরণকে মাথায় রেখেই বাংলাদেশকে এখন সামনের দিকে এগোতে হবে। শুধুমাত্র সস্তাশ্রমের দিকে তাকিয়ে না থেকে উচ্চ প্রযুক্তিতে কীভাবে দেশকে রূপান্তর করতে হয়, তা এখন ভিয়েতনামের কাছ থেকে শিখতে হবে। পাশাপাশি সেবা এবং সম্পদ কাজে লাগানোর ব্যাপারে নাইজেরিয়া ও ইন্দোনেশিয়াও আমাদের শিক্ষার ক্ষেত্র হতে পারে। সভ্যতা এখন পশ্চিমমুখী নয়, পূর্ব আকাশেই উদিত হচ্ছে ভবিষ্যতের আলোকিত ও ক্ষমতাবান এক নতুন দুনিয়া।



