ওয়াশিংটন প্রেসক্রিপশনের জাঁতাকল: যখন অর্থনীতিই গিলে খায় মানুষকে


এদেশের অর্থনীতি এখনো মূলত সস্তা শ্রমের পোশাক খাত আর রেমিট্যান্সের ওপর নির্ভরশীল, নেই কোনো শক্তিশালী জাতীয় শিল্পনীতি, স্বাধীন বাণিজ্য নীতি, কিংবা সর্বজনীন স্বাস্থ্য ও শিক্ষানীতি যা আমাদের নিজস্ব সক্ষমতা তৈরি ও টেকসই কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে পারত। প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশ আর কতদিন পরজীবী অর্থনীতির এই বৃত্তে বন্দি থাকবে? এই ফাঁদ থেকে বের হতে হলে আমাদের দাতা সংস্থাগুলোর অন্ধ দাসত্ব পরিহার করে “গণমানুষের অর্থনীতি”র মডেলে ফিরতে হবে।
৬ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ 'বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট' প্রতিবেদনটি আমাদের চোখ খুলে দেওয়ার বদলে বুক কাঁপিয়ে দেওয়ার মতো এক নির্মম সত্য উপহার দিয়েছে। গত মাত্র এক বছরে এদেশের আরও ২১ লক্ষ মানুষ নতুন করে "দরিদ্র" ক্যাটাগরিতে নাম লিখিয়েছেন। এটি কেবল কোনো সংখ্যার উত্থান নয়, এটি ২১ লক্ষ পরিবারের প্রতিদিনের ডাল-ভাতের যুদ্ধ হেরে যাওয়ার গল্প। বৈশ্বিক এই ঋণদাতার প্রাক্কলন বলছে, ২০২৫-২৬ ও ২০২৬-২৭ অর্থ বছরে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৩.৪ শতাংশেই আটকে থাকবে অর্থাৎ প্রবৃদ্ধির চাকা এখানে স্থবির হয়ে গেছে। ২০২৭-২৮ অর্থ বছরে সামান্য ঘুরে দাঁড়ানোর (৩.৯ শতাংশ) এক আশার বাণী শোনানো হলেও, বিশ্বব্যাংক নিজেই স্বীকার করেছে যে এই অর্থনৈতিক নিম্ন গতির শুরু হয়েছিল ২০২৩ অর্থ বছর থেকেই। তার মানে, গত কয়েক বছর ধরে তথাকথিত উন্নয়নের যে ফানুস ওড়ানো হয়েছিল, তার নিচেই চাপা পড়ে মরছিল এদেশের সাধারণ মানুষ, যা আজ প্রকাশ্য দিবালোকের মতো স্পষ্ট।
সংকটের মহাসমুদ্রে বিশ্বব্যাংকের সেই চর্বিতচর্বণ দাওয়াই
বিশ্বব্যাংকের এই রিপোর্টে বাংলাদেশের অর্থনীতির বেশ কিছু মৌলিক চ্যালেঞ্জের এক্স-রে করা হয়েছে। ব্যাংকিং খাতের নড়বড়ে দশা, পর্বতপ্রমাণ খেলাপি ঋণ, তীব্র জ্বালানি ও অবকাঠামো সংকট, আকাশচুম্বী মুদ্রাস্ফীতি এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের টানাপোড়েনকে তারা চিহ্নিত করেছে মূল খলনায়ক হিসেবে। আর এই গোলকধাঁধা থেকে বের হতে বিশ্বব্যাংক প্রতিবারের মতোই কিছু প্রচলিত সুপারিশ ছুড়ে দিয়েছে. যার মধ্যে রয়েছে, ব্যাংকিং খাতে সুশাসন ফেরানো, কর আহরণের পরিধি বাড়ানো এবং সবচেয়ে আশঙ্কাজনকভাবে, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের সার্বিক ভর্তুকি ক্রমান্বয়ে কমানো। তবে তারা গরীবদের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী শক্তিশালী করার কথা বললেও, তাদের মূল প্রেসক্রিপশন কিন্তু সেই বাজারমুখী সংকোচন নীতিই, যা প্রকারান্তরে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়কে আরও বাড়িয়ে তোলে।
Structural adjustment-এর বিষবৃক্ষ: ধ্বংস হলো যার নিজস্বতা
ইতিহাসের পাতা ওল্টালে দেখা যায়, ১৯৭২ সালে আইএমএফ ও বিশ্ব ব্যাংকের সাথে বাংলাদেশের প্রথম দফার আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু হয়েছিল। কিন্তু এদেশের অর্থনীতির সার্বভৌমত্ব হরণের প্রকৃত খেলা শুরু হয় ১৯৮০-এর দশক থেকে, যখন চাপিয়ে দেওয়া হয় কাঠামোগত সমন্বয় কর্মসূচি বা স্যাপ (স্ট্র্যাকচারাল অ্যডজাসমেন্ট প্রোগ্রাম)। এই কর্মসূচির মূল শর্তই ছিল সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর সংকোচন ও বেসরকারিকরণ, আমদানির লাগামহীন উদারীকরণ এবং রাষ্ট্রীয় স্বাস্থ্য ও শিক্ষাক্ষেত্র থেকে সরকারের অভিভাবকত্ব গুটিয়ে নেওয়া। পরবর্তীতে ১৯৮৭ সালে আইএমএফ চালু করে “বর্ধিত কাঠামোগত সমন্বয় সুবিধা", যা নব্বইয়ের দশক পর্যন্ত এদেশের নীতিনির্ধারকদের হাত-পা বেঁধে রেখেছিল। আইএমএফ ও বিশ্ব ব্যাংকের এই মনগড়া প্রেসক্রিপশনের কারণেই বাংলাদেশের অর্থনীতি নিজস্ব সক্ষমতা ও দেশীয় চাহিদানুযায়ী স্বাধীনভাবে গড়ে উঠতে পারেনি। অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান তাঁর বহু বিশ্লেষণে দেখিয়েছেন কীভাবে এই বিদেশী শর্তগুলো এদেশের শিল্পায়নের বিকাশকে পঙ্গু করে আমাদের পরনির্ভরশীল করে তুলেছে। গত এক বছরে দরিদ্রের সংখ্যা যে হু হু করে বেড়েছে, তার বীজ বোনা হয়েছিল ওই আশির দশকেই। আইএমএফ ও বিশ্ব ব্যাংক এই কাঠামোগত ধ্বংসযজ্ঞের দায় কোনোভাবেই এড়াতে পারে না।
একই সাথে, বাংলাদেশের বিগত সরকারগুলোও তাদের এই আত্মঘাতী শর্ত অন্ধের মতো বাস্তবায়নের দায় থেকে মুক্ত নয়, তারা ক্ষমতার লোভে দেশীয় স্বার্থকে ওয়াশিংটনের পুঁজিপতিদের কাছে বন্ধক রেখেছিল। অর্থনীতিবিদ ডেভিড হার্ভি “বঞ্চনার মাধ্যমে পুঁজি সঞ্চয়ন” হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন, যেখানে স্বাস্থ্য ও শিক্ষার মতো মৌলিক অধিকারকে পণ্যে রূপান্তর করে সাধারণ মানুষের পকেট কাটা হয়। বিগত সরকারগুলোর দুর্নীতি, ব্যাংকিং খাতে রাজনৈতিক প্রশ্রয়ে লুণ্ঠন এবং ক্রনি ক্যাপিটালিজম বা তোষামোদের অর্থনীতি প্রকারান্তরে এই আন্তর্জাতিক শোষণের পথকেই মসৃণ করেছে, যার মাশুল আজ দিতে হচ্ছে এদেশের ২১ লক্ষ নতুন দরিদ্র মানুষকে।
বিশ্বজোড়া ওয়াশিংটন কনসেনসাসের ধ্বংসস্তূপ ও আন্তর্জাতিক শিক্ষা
এই তথাকথিত কাঠামোগত সংস্কারের নামে আইএমএফ ও বিশ্ব ব্যাংক যে কেবল বাংলাদেশকেই ফতুর করেছে তা নয়, বিশ্বজুড়ে এর ভুরি ভুরি ট্র্যাজিক উদাহরণ রয়েছে। তাঁদের এই তথাকথিত কাঠামোগত সংস্কার কর্মসূচি পৃথিবীর যে প্রান্তেই প্রয়োগ করা হয়েছে, সেখানেই নেমে এসেছে অর্থনৈতিক বিপর্যয়। ১৯৮০ ও ৯০-এর দশকে লাতিন আমেরিকার দেশ আর্জেন্টিনা ও বলিভিয়া এবং আফ্রিকার ঘানা ও জাম্বিয়ার ওপর যখন এই শর্ত চাপানো হয়েছিল, তখন তাদের রাষ্ট্রীয় সম্পদ পানির দামে বেসরকারিকরণ করা হয় এবং স্বাস্থ্য-শিক্ষা খাত ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ জোসেফ স্টিগলিচ তথ্য-উপাত্ত দিয়ে দেখিয়েছেন কীভাবে আইএমএফ-বিশ্ব ব্যাংকের একঘেয়ে ও অবাস্তব শর্তসমূহ উন্নয়নশীল দেশগুলোর দারিদ্র্য কমানোর বদলে বৈষম্যকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। আফ্রিকার থিংক-ট্যাংক “আফ্রিকান ফোরাম অন নেটওয়ার্ক অন ডেট অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট” তাদের গবেষণায় স্পষ্ট করেছে যে, সাব-সাহারা অঞ্চলে স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাত থেকে রাষ্ট্র পিছু হটায় লাখ লাখ মানুষ চরম দারিদ্র্যের অতল গহ্বরে তলিয়ে গেছে। বর্তমান সময়ে এসেও আমরা দেখছি গ্রিস, পাকিস্তান কিংবা শ্রীলঙ্কার মতো দেশগুলোর অবস্থা এই ঋণের শর্ত পূরণ করতে গিয়ে আজ বাংলাদেশের মতোই—কিংবা তার চেয়েও চরম মানবিক ও অর্থনৈতিক সংকটে নিপতিত হয়েছে।
আমদানি নির্ভরতার ফাঁদ: আমরা কি আদৌ স্বাধীন হতে পারব?
আশির দশক থেকে শুরু করে বিগত সাড়ে চার দশক ধরে এই তথাকথিত কর্মসূচি বাস্তবায়ন করতে গিয়ে বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত আজ ঝুঁকির পাহাড়ে দাঁড়িয়ে, বিদ্যুৎ খাতের ভুল নীতি ও ক্যাপাসিটি চার্জের ফাঁদে তৈরি হয়েছে তীব্র জ্বালানি ও অবকাঠামো সংকট, এবং লাগামহীন মুদ্রাস্ফীতি সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতাকে পিষে ফেলছে। এদেশের অর্থনীতি এখনো মূলত সস্তা শ্রমের পোশাক খাত আর রেমিট্যান্সের ওপর নির্ভরশীল, নেই কোনো শক্তিশালী জাতীয় শিল্পনীতি, স্বাধীন বাণিজ্য নীতি, কিংবা সর্বজনীন স্বাস্থ্য ও শিক্ষানীতি যা আমাদের নিজস্ব সক্ষমতা তৈরি ও টেকসই কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে পারত। প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশ আর কতদিন পরজীবী অর্থনীতির এই বৃত্তে বন্দি থাকবে? এই ফাঁদ থেকে বের হতে হলে আমাদের দাতা সংস্থাগুলোর অন্ধ দাসত্ব পরিহার করে “গণমানুষের অর্থনীতি”র মডেলে ফিরতে হবে, যেখানে প্রাধান্য পাবে অভ্যন্তরীণ উৎপাদনশীলতা, কৃষি ও ক্ষুদ্র শিল্পের বিকাশ এবং রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে স্বাস্থ্য ও শিক্ষার সুরক্ষা। সার্বভৌম নীতিনির্ধারণের সাহস ও রাজনৈতিক সদিচ্ছা ছাড়া আইএমএফ-বিশ্ব ব্যাংকের এই সুনিপুণ ফাঁদ থেকে মুক্তির কোনো বিকল্প পথ নেই।
-- --
লেখক: নির্বাহী সম্পাদক, ঢাকা পেপারস।



