সুইটি ও নজরুলের মৃত্যুদণ্ডঃ বাংলাদেশের কাটামাথা


...কোন শরিয়া আইনের মর্যাদা আমার বাঙলার মায়েদের চেয়ে বেশি নয়। তাই আজ এই মুহূর্তে এখনই সৌদিতে নারী শ্রমিক রপ্তানি বন্ধ কর, লুটপাট হওয়া পাচারকৃত অর্থ ফিরিয়ে এনে সেই টাকা দিয়ে তাদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা কর এবং যারা সৌদি গেছে তাদেরকে রাষ্ট্রীয় ক্ষতিপূরণ দিয়ে ফিরিয়ে আনতে হবে।
সৌদি আরবের মক্কা নগরীর একটি মসজিদে চুমু খাওয়ার অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করার পর দুই বাংলাদেশি নাগরিকের শিরচ্ছেদ করে সৌদি সরকার। তাদের মধ্যে একজন সুইটি আক্তার। প্রেমিককে চুমো খাবার অপরাধে মৃত্যুদন্ড পাওয়া সুইটি আক্তার, তার পরিবার কোথায়? কে তার স্বজন? আমরা জানতে চাই সুইটি আক্তারকে।
কিন্তু, সুইটি আক্তারের প্রসঙ্গে যাবার আগে, একটা অস্বস্তিকর গল্প লিখবো আপনাদের জন্য। গল্প বলতে আসলে সত্যি ঘটনা। ঘটনাটা আমা, আমার নিজের জীবনের। সিঁথির পরিচয় যেহেতু প্রকাশ করবো নিজের কথা গোপন রাখাটা অন্যায় হবে, পাপ হবে।
তাই সুইটি ঘটনাটা বলার আগে আমার পরিচয় আপনাদের জনাই। নিজের পরিচয় আসলে দিতে আমার খুব লজ্জা হচ্ছে। আমি এক অভিশপ্ত পুত্র যাকে ফেলে তার বাপ চলে গেছে আরেক বিয়ে করে আর আমাকে আমার নানাবাড়িতে রেখে আমার মা গিয়েছিলো সৌদি আরব- একমাত্র সন্তানকে মানুষ করবে তাই; আমি আমার মায়ের টাকায় বড় হয়ে শিক্ষিত হয়েছি আর আমার মায়ের লাশ এসে পৌঁছেছে বাংলাদেশের বিমানবন্দরে। অবশ্য আমার পরিচয় আমি খোলাসা করে দিবোনা আপনাদের, সেই সাহস আমার নেই। এমনও হতে পারে যে, আমি এক অপদার্থ ভাই যার বোন সৌদিতে গেছে কাজ করতে আর ফেরার তার বোনের জামাই তাকে ঘরে তোলেনি, কিংবা আমি এক ব্যার্থ প্রেমিক যার -প্রেমিকা সৌদি চলে গেছে কারণ আমি তাকে বিয়ে করে ঘরে তুলবার মতো টাকা যোগাতে পারিনি অথবা ধরা যাক, আমি সেই অমানুষ পিতা যে নিজের কন্যাকে পাঠিয়েছে সৌদি আরবের কফিল শেখের কাছে বিক্রি করে। আমিই সেই প্রাচীন পাপিষ্ঠ যে তার নিজের কন্যাকে বিক্রি করে দেয় দাস বাজারে।
আমার বোনের নাম গোলাপী, আমার প্রেমিকার নাম শ্যাফালি, আমার কন্যার নাম নার্গিস আর আমার মায়ের কোন নাম ছিলোন। অবশ্য এদেশের আমাদের সৌদি প্রবাসী মায়েদের নাম আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ নয়, আমাদের বোনেদের পরিচয়, আমাদের কন্যার অশ্রু এসব আমরা গোপন রাখি। আর আমাদের প্রেয়সীরা তো চিরকালই গোপন। ওদের নাম গুরুত্বপূর্ণ নয়, ওদের পরিচয় আমরা লুকিয়ে রাখি কারণ এটা সামাজিক লজ্জা। শুধু ওদের পাঠানো টাকা আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ, আমাদের রাষ্ট্রের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। ওদের জীবন আমরা বিক্রি করেছি রেমিটেন্সের দামে।
এই যেমন; কোন পরিবার এখনো সুইটি আক্তারের জন্য এসে গর্বিত হয়ে দাঁড়ায়নি ক্যামেরার সামনে। যারা বোঝার এতোক্ষনে বুঝে ফেলেছেন, আমি নিজের গল্প বলতে আসলে সুইটি আক্তারের গল্পই বলছিলাম আর আমিই সুইটি আক্তারের সেই কাপুরুষ ভাই,যে সুইটি আক্তারের পাঠানো টাকা আরাম করে খেয়েছি কিন্তু ও যখন ধরা পড়লো তখন আর ওর পরিচয়ও দিচ্ছি না। ঘাপটি মেরে বসে আছি।
ইছামতি নদীর তীরে নরম নোলক পরা আমার চঞ্চল কিশোরী বোন সুইটি; আমার বোন আরেক প্রবাসীর সঙ্গে প্রেম করেছিলো। এই অপরাধে আমার বোনটার গলা কেটে ফেলা হয়েছে। আমার বোনের টাকা আমরা খেয়েছি কিন্তু এখন আর ওর পরিচয় দিচ্ছিনা। এই রাষ্ট্র আমার বোনের ভাগের টাকাটা খেয়েছে অথচ এখন আমার বোনের মৃত্যুতে এই রাষ্ট্রের আর কিছু যায় আসেনা।
সুইটি কিংবা সুইটির মতো আমার যেই বোনেরা আছে– তারা এই দেশের কাছে অস্বস্তির, সমাজের কাছে লজ্জার; কিন্তু আজ, বাঙলার নদীর ধারে নাকে নোলক পরে মাথা দোলাতে থাকা আমার বোন সুইটি আক্তারের মাথাটা যখন মরুভূমির জলহীন, কাদামাটির সোঁদাগন্ধহীন, মায়াদয়াহীন ধুলায় রক্তের ফিনকি ছোটাতে ছোটাতে আছড়ে পড়েছে, তখন সুইটি আক্তারের নামে আমরা সেই সৌদি প্রবাসিনীদের কথাই লিখবো, তাদেরই বিষয়ে বারবার আলোচনা তুলবো। তারপর আবার আসবো আমার বোন সুইটি আক্তারের প্রসঙ্গে, কিন্তু তার আগে লক্ষ্য করুন- ২০২৫ সালের মার্চে বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনের তথ্যমতে ২০০৪ সাল থেকে আজ ২০২৫ সাল পর্যন্ত ৫ লক্ষ ২৪ হাজার ৭৮৮ জন বাংলাদেশী নারী সৌদি আরব গিয়েছেন গৃহকর্মী হিসেবে। সাধারণত ২ বছরের চুক্তিতে তারা যান। কিন্তু তাদের মধ্যে কতজন কবে ফিরে এসেছেন সেই তথ্য বাংলাদেশ সরকারের কাছে নেই। বাংলাদেশ সরকার জানেনা। কখনো জানতে চায়নি।
কিন্তু প্রবাসী কল্যাণ বোর্ডের হিসাবে গত আট বছরে ৭৯৯ জন নারী শ্রমিকের লাশ দেশে এসেছে, অর্থাৎ বছরে গড়ে প্রায় ১০০ জন। ২০২১ থেকে পাঁচ বছরে ৪১২ জন নারী শ্রমিকের লাশ ফিরেছে, যাঁদের মধ্যে ৮৪ জন আত্মহত্যা করেছেন।
প্রায় প্রতি পাঁচজনে একজন নারীই আত্মহত্যা করেছেন। ২০২২ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে শুধু সৌদি থেকেই ১৫ হাজারের বেশি নারী ফিরেছেন, অর্থাৎ বছরে প্রায় ৩,৭০০ জন। সব দেশ মিলিয়ে ২০১৯ থেকে ফিরেছেন প্রায় ৭০ হাজার নারী। এবং অভিবাসী কর্মী উন্নয়ন প্রোগ্রামের গত বছর প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, দেশে ফেরা ৯৪ শতাংশ নারী নিয়মিত শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হন। আর আঁতকে ওঠার মতো তথ্য হচ্ছে, দেশে ফেরা নারীদের ৪৭ শতাংশ নারী যৌন নির্যাতনের শিকার। আর ৯৭ শতাংশ নারী চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত হন। ফলে দেশে ফেরা ধর্ষণের শিকার নারীদের অনেকেই ফেরেন গর্ভবতী হয়ে!
টাকার লোভে যেই স্বামী একদিন স্ত্রীকে সৌদি পাঠায়, নির্যাতিত হয়ে দেশে ফেরার পর সেই স্ত্রীকে আর ঘরে তোলেনা স্বামী। যারা সৌদি আরবে কফিলদের হাতে খুন হয় কিংবা ধর্ষণের শিকার হয়ে আত্মহত্যা করে তারা একরকম বেঁচেই যায়। আর যেই মেয়েগুলো বেঁচে ফেরা; তাদের জন্য অপেক্ষা করে সমাজের কলঙ্ক, পরিবারের প্রত্যাখ্যান, প্রিয়জনদের বিশ্বাসঘাতকতা।
কিন্তু কেন আমরা বাংলাদেশের মেয়েদের পাঠাচ্ছি সৌদি আরবে? ঠিক কত টাকায় আমরা বিক্রি করছি বাঙলার বিলের ধারের আলুথালু শাড়ি পরিহিতা আমাদের সহজ স্বভাবের কন্যাদের, সৌদি কফিলের বিছানায়?
২০১৯ সালে করা এক সাংবাদিক সম্মেলনে দেশের তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্দুল মোমেন সংবাদ মাধ্যমকে বলেছিলেন, দেশের আড়াই থেকে তিন লক্ষ নারী শ্রমিক সৌদি আরবে আছে। গত সাত বছরে এই সংখ্যা কমেছে। নারীদের যাওয়ার হার কমেছে । আর দুই বছর মেয়াদ শেষ করার আগেই ফিরে এসেছেন অনেক অনেক নারী। তবুও হিসাবের স্বার্থে ধরে নিচ্ছি এখন সৌদিতে আছেন আড়াই লক্ষ নারীই।
তারা প্রতিবছর কত টাকা পাঠান দেশে? সৌদিতে যাওয়া নারীদের বেতন হয় ৮০০ থেকে ১,০০০ রিয়েল। যদিও সৌদিতে টিকে থাকতে বা সঞ্চয়ে কেউই তার পুরো বেতন দেশে পাঠায় না তবুও ধরে নিলাম এই আড়াই লাখ নারী সবাই মাসে দেশে ১ হাজার রিয়েল করে পাঠান। এভাবে হিসাব করলে দেখা যায়, প্রতিবছর সৌদি আরব থেকে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা বাংলাদেশে পাঠান এই নারী শ্রমিকরা। দশ হাজার কোটি টাকার দামে আমরা এই বাংলার লক্ষ লক্ষ মা বোনকে সৌদি পাঠিয়েছি যৌন নির্যাতনের শিকার হতে।
অথচ, এই বাংলাদেশ থেকে প্রতিবছর পাচার হয়ে যায় ১ লক্ষ ৯২ হাজার কোটি টাকা। এই বাংলাদেশে ভাড়া ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রে চুক্তি অনুযায়ী বিদ্যুৎকেন্দ্র উৎপাদন করুক বা না করুক, সরকারকে ভাড়া দিতে হয়। গত অর্থবছরে এই কেন্দ্রভাড়া দাঁড়িয়েছে ৪২ হাজার কোটি টাকায়, এক বছরে বেড়েছে ১০ হাজার কোটি। অর্থাৎ শুধু এই এক বছরের বৃদ্ধিটাই নারী শ্রমিকদের সারা বছরের আনুমানিক আয়ের সমান। চাহিদার চেয়ে প্রায় নয় হাজার মেগাওয়াট অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতা রয়েছে। বর্তমান অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীও সংসদে বলেছেন, এই খাতে লুটপাট ও অর্থ পাচার হয়েছে।
এদিকে জুন ২০২৬ শেষে খেলাপি ঋণ ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা, যা বিতরণ করা মোট ঋণের ৩২.৭৮ শতাংশ। এক বছরে বেড়েছে ৭৬ হাজার ১২৭ কোটি টাকা। এই টাকা জনগণের আমানত, আর খেলাপি ব্যাংককে বাঁচাতে শেষে সরকারি অর্থ ঢালতে হয়।
বাংলাদেশ কি গরীব দেশ? এইযে লক্ষ লক্ষ কোটি টাকা অপচয়, পাচার আর লুটপাট , এই টাকার খুব সামান্য অংশ দিয়েই কি ওই আড়াই লক্ষ সৌদিগামী নারীর জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারে না সরকার এই মাটিতে?
যে দেশে হাজার হাজার কোটি কোটি টাকা কোন বিদ্যুৎ উৎপাদন না করেই আদানি গ্রুপ ভর্তুকি পায়, যে দেশে লক্ষ লক্ষ কোটি টাকা পাচার হয় , লক্ষ লক্ষ কোটি টাকা ঋণ খেলাপি হয় সে দেশের মেয়েদের মাত্র ১ হাজার সৌদি রিয়েল অর্থাৎ মাসে ৩২-৩৩ হাজার টাকা বেতনের জন্য সৌদিতে গিয়ে এমন নির্যাতনের শিকার হতে হয়। এই বাঙলার দুঃখিনী ওই প্রবাসী মেয়েরা যেন সেই ধনী রাজার দুয়ো রানীর মেয়ে, যেই রানীকে রাজা রাখা দাসীর মতো আর কোষাগার ভর্তি সোনা রেখেও যেই রানীর সন্তানেরা থাকে না খেয়ে। কি অপরাধে কোন পাপে মানুষ এমন অবিচারের দেশে জন্মায়? সামগ্রিকভাবে পুরুষ ও নারী শ্রমিক মিলিয়ে ২০২৬ সালের প্রথম ৯ মাসেই সৌদি আরবসহ বিভিন্ন দেশ থেকে ৪,০৬০ জন প্রবাসী শ্রমিকের লাশ এসেছে, যার মধ্যে বরাবরের মতোই সৌদি আরব থেকে সবচেয়ে বেশি মরদেহ এসেছে।
আবার ফিরে আসি আমাদের বোন সুইটি আক্তারের প্রসঙ্গে। বাংলাদেশ ও সৌদি আরব উভয়ই কনস্যুলার সম্পর্কবিষয়ক ভিয়েনা সনদের পক্ষভুক্ত দেশ। কূটনৈতিক ও কনস্যুলার সম্পর্কবিষয়ক ভিয়েনা সনদের ৩৬ অনুচ্ছেদে বিদেশি নাগরিক আটক বা বন্দি হলে তার অনুরোধে নিজ দেশের কনস্যুলার কর্তৃপক্ষকে অবিলম্বে জানানোর বিধান রয়েছে। একই সঙ্গে আটক ব্যক্তিকে কনস্যুলার সহায়তা পাওয়ার অধিকার সম্পর্কে অবহিত করার কথাও বলা হয়েছে।
এই দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড আপিলসহ বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে কার্যকর করা হয়েছে। ফলে বিচারটি একদিনে সম্পন্ন হয়নি। অথচ এই দীর্ঘ সময়ে সৌদি কর্তৃপক্ষ এই তথ্য বাংলাদেশকে জানায়নি। যেটা স্পষ্টতই ভিয়েনা কনভেনশনের লঙ্ঘন। ফলে বাংলাদেশ সরকারের উচিত আন্তর্জাতিক আদালতে সৌদির বিরুদ্ধে মামলা করা। কিন্তু সেই মামলা করবে কি বাংলাদেশ সরকার?
ইতোমধ্যেই বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতি-মন্ত্রী শামা ওবায়েদ বলেছেন, এই ঘটনা নাকি বাংলাদেশের প্রবাসীদের জন্য একটা বড় শিক্ষা।
শিক্ষাই বটে! প্রতি-মন্ত্রী শামা ওবায়েদের বাবা ছিলেন দীর্ঘদিনের সাংসদ, তিনি নিজেও আজ মন্ত্রী। তাঁর স্বামী অনেক বড় রিয়েল এস্টেট ব্যবসায়ী। তাঁদের মতো উঁচুতলার মানুষদের কাছে আমাদের মতো গরীবের বোনের মৃত্যু কেবল একটা শিক্ষা হিসাবেই পরিগণিত হবে। ফলে তাঁদের বক্তব্যেও কোন প্রতিবাদ দেখা যাবেনা। কিন্তু আমাদের মতো গরীব, শুটকি খাওয়া, ছেড়া জামা পরা চাষাভুষাদের ভোটেই তো শামা ওবায়েদরা এমপি মন্ত্রী হন। আমাদের বোনের রক্ত পানি করা আর ধর্ষিতা হয়ে কবরে চলে যেতে যেতে পাঠানো রেমিটেন্সের টাকায়ই তো উনাদের মতো সংসদ সদস্যদের জন্য বরাদ্দ করা হয় বিনা ট্যাক্সের গাড়ি। তাইনা?
তাই যদি হয় তাহলে একটা কথা জেনে রাখুন, সৌদির ওই শরিয়া আইনে সৌদি কফিলেরা বাঙালি মেয়েকে ধর্ষণ করলে কোন সমস্যা হয়না। কারন বাঙালি মেয়েরা ওখানে হয় তাদের ডান হাতের অধিকারভুক্ত দাসী তাইনা? এই হল তাদের শরিয়া আইন, এটাকেই কি বলে আল্লাহর জমিনে আল্লাহর আইন?
ইসলামী শরিয়া আইনে তো ধর্ষণ প্রমাণ করতে হলে চার জন স্বাক্ষ্মী লাগে। কিন্তু ৪ জন স্বাক্ষ্মী কোথায় পাওয়া যাবে? রান্না ঘরের পাশের স্টোর-রুমে বাঙালি মেয়াটাকে যখন বাবা আর ছেলে মিলে পালাক্রমে ধর্ষণ করে তখন কোন স্বাক্ষ্মী তো থাকেনা, থাকার সুযোগও থাকেনা। ফলে শরিয়া আইনের কাছে কোন বিচার পায়না এই বাঙলার নদীর ধারের লালসালু বান্ধা বেদাতি বটগাছের নিচের এক্কাদোক্কা খেলে বড়া হওয়া কিশোরী মেয়েরা। তবুও তো সহীই শরিয়া আইন, তবুও তো ইসলামী শাসন। আল-হামদুলিল্লাহ না বলে যাওয়া যায় না!
তবে সৌদির ওই শরীয়া আইন কিন্তু বাংলাদেশের মানুষের জন্যই। যখন পশ্চিমাদেশ গুলোর নাগরিকেরা একই অপরাধ করে তখন আর তাদের শরীয়া আইনের কঠোরতা শিথিল হয়ে যায় আর বিনা সাজায়ই দেশে ফিরে যায় ওই পশ্চিমা নাগরিকেরা।
ফলে আমার ওইযে বোনটি সুইটি, ও কাউকে ভালোবেসে চুমো খাওয়ার অপরাধে ওর গলা কেটে ফেলা হয়েছে কিন্তু ওর ধর্ষকরা গায়ে হাওয়া লাগিয়ে ঘুরে বেড়ায় কি চমৎকার!
সৌদিতে গৃহকর্মীদের নির্যাতন ও মৃত্যুদণ্ডের প্রতিবাদে ইন্দোনেশিয়া ২০১১ ও ২০১৫ সালে দুবার সেখানে গৃহকর্মী পাঠানো বন্ধ করেছিল। শেষে ২০২৫ সালে রেমিট্যান্সের টানে আবার দরজা খোলে, তবে ন্যূনতম ১,৫০০ রিয়াল বেতনের শর্তে। ফিলিপাইনও নির্যাতন ও বকেয়া বেতনের অভিযোগে ২০২১ সালে এক বছরের জন্য কর্মী পাঠানো বন্ধ রেখেছিল, আর শ্রমিক সুরক্ষার শর্ত আদায় করেই আবার পাঠিয়েছে। আর আমাদের প্রতিবেশী দেশ নেপাল ২০১৭ সাল থেকে আজও উপসাগরীয় দেশে নারী গৃহকর্মী পাঠানো নিষিদ্ধ রেখেছে। অথচ বাংলাদেশ মাত্র ৮০০ রিয়ালে মেয়েদের পাঠিয়েছে, কোনো শর্ত ছাড়াই। এতো সস্তা কেন আমাদের জীবন?
সৌদি আরব থেকে ধর্ষিতা ও গর্ভবতী হয়ে ফেরা গোলাপী আমার বোন, সৌদি থেকে আত্মহত্যা করে ফেরা নার্গিস আমার কন্য আর সৌদি থেকে কোনদিন না ফেরা মেয়েটিই আমার মা।
এই বাঙলার এই অসহায় মেয়েগুলি, আমার এই গরীব মা বোনের দল, আপনার কেউ হয়না পাঠক? যদি হয় তাহলে আওয়াজ তুলুন বাংলার মা বোনদেরকে যৌনদাসী হবার জন্য সৌদি আরবে পাঠানো যাবেনা। এই বাঙলার মেয়েদেরকে ধর্ষণ করা যাবেনা, কোন শরিয়া আইনের মর্যাদা আমার বাঙলার মায়েদের চেয়ে বেশি নয়। তাই আজ এই মুহূর্তে এখনই সৌদিতে নারী শ্রমিক রপ্তানি বন্ধ কর, লুটপাট হওয়া পাচারকৃত অর্থ ফিরিয়ে এনে সেই টাকা দিয়ে তাদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা কর এবং যারা সৌদি গেছে তাদেরকে রাষ্ট্রীয় ক্ষতিপূরণ দিয়ে ফিরিয়ে আনতে হবে।
লেখক: কবি ও সাংবাদিক


