একদিকে ১৯টির বেশি লাশ, অন্যদিকে মার্ক্সবাদী স্টলে ফ্যাসিস্ট হামলা— কলকাতায় উমার মুখ ম্লান

ছবিঃ সংগৃহীত
দুর্গাপূজা শুরু হওয়ার আগেই পশ্চিমবঙ্গের বাঙালিকে পূজার সময় নিরামিষ খাওয়ার ফতোয়া থেকে শারদীয়া বইয়ের স্টলে হামলা, আর তার মাঝে পদপিষ্ট হয়ে ১৯ জনের বেশি মানুষের মৃত্যু— সব মিলিয়ে বিজেপি শাসনে কলকাতা তথা পশ্চিমবঙ্গের শারদোৎসব ম্লান।
বাঙালির অন্যতম শ্রেষ্ঠ উৎসবের মহাসপ্তমীর প্রথম রাত যে কলকাতায় এমন এক ভয়াবহ ট্র্যাজেডিতে রূপ নেবে, তা কেউ কল্পনাও করতে পারেনি। শনিবার সন্ধ্যা আনুমানিক ৭টা ৪০ মিনিট নাগাদ উত্তর কলকাতার গিরিশ পার্ক থানা এলাকার চোরবাগান র্বজনীন দুর্গোৎসব মণ্ডপে হুড়োহুড়ি ও চরম বিশৃঙ্খলার জেরে পদপিষ্ট হয়ে ৪ জন শিশু ও ১৩ জন মহিলাসহ মোট ১৯ জনের বেশি দর্শনার্থীর মর্মান্তিক মৃত্যু হল। আহত হয়েছেন ৩৫ জনেরও বেশি মানুষ।
যে কলকাতা পুলিশ পেশাদারিত্বে বরাবর প্রশংসা অর্জন করেছে, বিজেপি শাসনে সেই পুলিশকেই দেখা গেল সম্পূর্ণ অযোগ্য ও অপেশাদারিত্বর ভূমিকায়। ভিড় নিয়ন্ত্রণ তো দূরের কথা এরমক বিপর্যয়ের পরেও তাদের তৎপরতা মানুষের চোখে পড়েনি। উল্টো এই কলকাতা পুলিশকেই দেখা গিয়েছে যাদবপুরে বুলডোজার নিয়ে বিভিন্ন বামপন্থী দল ও সংগঠনের শারদীয়া বইয়ের স্টল ভাঙতে, মার্ক্সবাদী বুক স্টল করার জন্য বামপন্থী কর্মী-সমর্থকদের ওপর লাঠি চালাতে। রীতিমতো আরএসএস-বিজেপির গুণ্ডাদের সঙ্গে নিয়ে যাদবপুরে প্রথম সপ্তমীর রাত জুড়ে তাণ্ডব চালালো পুলিশ। আর উত্তর কলকাতার চোরবাগানে তখন মানুষের হাহাকার। শিশু থেকে প্রবীণ মানুষের রক্তাক্ত লাশ পড়ে আছে রাস্তায়। যার জেরে কলকাতায় এবারের শারদোৎসব বিবর্ণ। অন্ধকার নেমে এসেছে কলকাতার জনমানসে। বিষাদ ছেয়ে গিয়েছে মণ্ডপে অধিষ্ঠাত্রী উমার মুখমণ্ডলে। শূন্য পানে চেয়ে তিনিও বোধহয় প্রহর গুণছেন, এই দীর্ঘ অন্ধকার রজনীর অবসান কখন হবে সেই চিন্তায়।
যদিও এই ঘটনার খবর সামনে আসতে বাধ্য হয়ে প্রশাসনের তরফে নির্দেশ জারি করা হয়, চোরবাগানের মণ্ডপটি দর্শনার্থীদের জন্য সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়ার জন্য। সংলগ্ন এলাকায় নবমী পর্যন্ত ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতার ১৬৩ ধারা (বেআইনি জমায়েত নিষেধাজ্ঞা) জারি করা হয়। দর্শনার্থীদের নিরাপত্তায় গাফিলতির অভিযোগে অনিচ্ছাকৃত খুনের মামললায় গ্রেফতার করা হয় পূজা কমিটির ৭ কর্মকর্তাকে। যদিও পূজা কমিটির প্রধান পৃষ্ঠপোষক দেবদীপ অধিকারীর কেশাগ্রও স্পর্শ করেনি পুলিশ। কারণ দেবদীপ অধিকারী হলেন শুভেন্দু অধিকারীর ভাইপো। ওই পূজা কমিটির আরেক কর্মকর্তা তমোঘ্ন ঘোষ যিনি বিজেপির রাজ্যস্তরের নেতা, তাঁর বিরুদ্ধে কোনোরকম পদক্ষেপ করেনু কলকাতা পুলিশ।
বিপর্যয় ঠিক কীভাবে ঘটল?
সপ্তমীর সন্ধ্যায় চোরবাগানের মণ্ডপে দর্শনার্থীদের উপচে পড়া ভিড় ছিল। ঠিক সেই সময় আচমকা উত্তর কলকাতায় মুষলধারে বজ্রবিদ্যুৎ-সহ ভারী বৃষ্টি শুরু হয়। মণ্ডপের বাইরে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা হাজার হাজার মানুষ বৃষ্টির হাত থেকে বাঁচতে একসঙ্গে মণ্ডপের ভেতরে এবং সংকীর্ণ প্রস্থান দ্বারের দিকে ছুটে যাওয়ার চেষ্টা করেন।
একদিকে ভারী বৃষ্টি, অন্যদিকে মণ্ডপের অত্যন্ত সরু প্রবেশ ও প্রস্থান পথ—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি মুহূর্তের মধ্যে হাতের বাইরে চলে যায়। বৃষ্টির কারণে মাটি পিছল হয়ে যাওয়ায় হুড়োহুড়ির মধ্যে বেশ কয়েকজন দর্শনার্থী রাস্তায় পড়ে যান এবং তাঁদের ওপর দিয়েই পেছনের উন্মত্ত জনতা চলাচল করতে শুরু করে। মণ্ডপের এক্সিট গেটের একটি অংশও ভিড়ের চাপে ভেঙে পড়ে বলে জানা গেছে। প্রায় আধ ঘণ্টা ধরে চলা এই চরম বিশৃঙ্খলার মধ্যে শ্বাসরুদ্ধ হয়ে ও পিষ্ট হয়ে বহু মানুষ মণ্ডপের ভেতরেই জ্ঞান হারান। অনেকের ঘটনাস্থলেই মৃত্যু হয়। হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পথে মৃত্যু হয় কারো কারো। রাজ্য সরকার ১৯ জনের মৃত্যুর কথা বললেও মৃতের সংখ্যা ৫০-৬০ হতে পারে বলে স্থানীয়দের বক্তব্য।
রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া
এই ঘটনার দায় সরাসরি পশ্চিমবঙ্গের পুলিশ মন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর উপর চাপিয়েছেন বিরোধীরা। সিপিএম নেতা শতরূপ ঘোষ ও মমতা-তৃণমূল কংগ্রেসের বিধায়ক কুণাল ঘোষ একসাথে গিরীশ পার্ক থানায় বিক্ষোভ করেন। বিক্ষোভ কর্মসূচি থেকে দেবদীপ অধিকারীর গ্রেফতারের দাবি করেছেন তাঁরা। মমতা-তৃণমূল সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় প্রশ্ন তুলেছেন যে মণ্ডপের ভিতরে পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা না থাকা সত্ত্বেও, ভিড় নিয়ন্ত্রণে অকার্যকরী এলিভেটেড করিডোর দেখার পরেও এই মণ্ডপের নকশায় কীভাবে অনুমতি দিল কলকাতা পুলিশ! সিপিএমের রাজ্য সম্পাদক মোহাম্মদ সেলিমও এই ঘটনায় পুলিশ ও পুলিশ মন্ত্রীকে কাঠগড়ায় তুলেছেন। তাঁর বক্তব্য, “পুলিশের অপদার্থতার জন্যই এতগুলো মানুষের প্রাণ গেল।” পাশাপাশি তাঁর আরও বক্তব্য, “বামপন্থীদের বইয়ের স্টল ভাঙতে পুলিশ যতটা সক্রিয় থেকেছে, ঠিক ততটাই নিষ্ক্রিয় থেকেছে ভিড় নিয়ন্ত্রণে। আর সে কারণেই এমন ঘটনা।” যদিও দায় ঝেড়ে ফেলতেই চাইছেন শুভেন্দু অধিকারী। তাঁকে দেখা গেল, উত্তরবঙ্গে মেঘ ভাঙা বৃষ্টিতে বিপর্যয় নেমে আসাকালীন সাবেক মুখ্যমন্ত্রী কেন উৎসবে মেতে উঠেছিলেন তা নিয়ে প্রশ্ন করতে।
একদিকে লাশে অন্যদিকে বইয়ের স্টলে ফ্যাসিস্ট হামলা
১৯৩৩ সাল্লে নাৎসি পার্টির ছাত্রসংগঠন ও জোয়েফ গোয়েবলসের উদ্যোগে বার্লিনের ওপার্নপ্লাটজ-সহ জার্মানির বিভিন্ন শহরে ‘অ-জার্মান ভাবধারা’ দাবি করে কমিউনিস্ট ও সমাজতান্ত্রিক বিভিন্ন বই, শান্তিবাদী সাহিত্য ও আর্নেস্ট হেমিঙ্গোয়ে এইচ জে ওয়েলস ও হেলেন কেলারের মতো লেখকদের বই পুড়িয়ে ফেলা হয়েছিল যেভাবে, ঠিক সেই ইতিহাসের পুনরাবৃত্তিও হল কলকাতার যাদবপুরে প্রথম মহাসপ্তমীর সন্ধ্যা থেকে মধ্যরাত অবধি।
যখন একদিকে উত্তর কলকাতার চোরবাগানে মানুষের হাহাকার আর লাশের মিছিল, ঠিক তখনই যাদবপুরে বুলডোজার নিয়ে মার্ক্সবাদী বইয়ের সাময়িকী স্টলগুলির ওপর চললো কলকাতা পুলিশ ও আরএসএস-বিজেপির দুষ্কৃতীদের হামলা। প্রতিবছরের মতোই এবছরও শারদীয়া উৎসব উপলক্ষে সিপিএম, সিপিআই, সিপিআইএমএল, আরএসপি, এসইউসারের মতো দলগুলি এবং তাদের ছাত্র ও সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলি গোটা পশ্চিমবঙ্গ জুড়েই বইয়ের স্টল বসিয়েছে। কিন্তু আগেই মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু হুঙ্কার ছেড়েছিলেন যে এই বইয়ের স্টলগুলিতে ‘শারদীয়া’ লেখা চলবে না। লিখতে হবে ‘দুর্গাপূজা’। তাঁর সেই হুঙ্কারে কেউ পাত্তা দেয়নি। এরপর দিল্লিতে চলমান ছাত্র-জনতার আন্দোলনে বামপন্থীদের জোরালো অবস্থান দেখে শুভেন্দু ও তাঁর দলবল বামপন্থীদের শত্রু চিহ্নিত করেছে। আর তাই মার্ক্সবাদী শারদীয়া বইয়ের স্টলগুলিতে তান্ডব চালিয়েছে বিজেপি অনুগত কলকাতা পুলিশ ও আরএসএস-বিজেপি-সহ হিন্দুত্ববাদী শিবির। প্রথমে মহাপঞ্চমীর সন্ধ্যায় কলকাতার ঢাকুরিয়ায় সিপিআই(এমএল)-লিবারেশনের বুকস্টকে হামলা চালিয়ে বাবুন চক্রবর্তী নামের এক রাজনৈতিক কর্মীর মাথা ফাটিয়ে দেয় হিন্দুত্ববাদী দুষ্কৃতীরা। এরপর মহাসপ্তমীর সন্ধ্যায় পুলিশের র্যাপিড অ্যাকশন ফোর্স বুল্ডোজার নিয়ে এসে যাদবপুরে বামপন্থী বইয়ের স্টলগুলো ভাঙার চেষ্টা চালায়। ছাত্রজনতার ব্যারিকেডে অনেকাংশেই হার মানে ফ্যাসিস্ট বাহিনী। কিন্তু রবিবার ভোরে ফের হামলা চলে। ভেঙে দেওয়া হয় বহু স্টল। আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হয় বহু বই।
অর্থাৎ দুর্গাপূজা শুরু হওয়ার আগেই পশ্চিমবঙ্গের বাঙালিকে পূজার সময় নিরামিষ খাওয়ার ফতোয়া থেকে শারদীয়া বইয়ের স্টলে হামলা, আর তার মাঝে পদপিষ্ট হয়ে ১৯ জনের বেশি মানুষের মৃত্যু— সব মিলিয়ে বিজেপি শাসনে কলকাতা তথা পশ্চিমবঙ্গের শারদোৎসব ম্লান। বিষণ্ণ উমা এই হাহাকার, এই অশ্রু এই অশিক্ষা ও বর্বরতার অভিজ্ঞতা নিয়েই ফিরে যাবেন তাঁর পতিগৃহে।
--
লেখক: কবি, প্রাবন্ধিক ও সাংবাদিক, কলকাতা, ভারত।
ইমেইল- [email protected]


