পোশাকশ্রমিকের ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা: কেন জরুরি?

রোকন-উজ-জামান
রোকন-উজ-জামান
প্রকাশ: ১৬ অক্টোবর ২০২৬, ১২:৫৮পরিবর্তন করতে ক্লিক করুন
পোশাকশ্রমিকের ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা: কেন জরুরি?

ছবিঃ সংগৃহীত

শেয়ার করুন:

সব মিলিয়ে কেবল কোনোমতে নিঃশ্বাসটুকু টিকিয়ে রেখে বেঁচে থাকার জন্যই মাসে এখন প্রায় ২৬ হাজার টাকার প্রয়োজন। ফলে মাত্র সাড়ে ১২ বা ১৩ হাজার টাকা বেতন পেয়ে প্রতি মাসেই শ্রমিকদের ঋণের জালে জড়াতে হচ্ছে।

প্রতিদিন ভোরে ঘুম থেকে উঠে লাখো পোশাক শ্রমিক দল বেঁধে ছুটে যান কারখানার দিকে।তাদের হাড়ভাঙা খাটুনি আর গায়ের ঘামেই সচল থাকে দেশের অর্থনীতির সবচেয়ে বড় চাকাটি। অথচ মাস শেষে তারা যে পারিশ্রমিক পান, তা দিয়ে বর্তমান বাজারে টিকে থাকা অসম্ভব। কাগজে-কলমে বর্তমানে একজন সাধারণ শ্রমিকের ন্যূনতম মজুরি ১২ হাজার ৫০০ টাকা, যা ২০২৩ সালের ডিসেম্বর থেকে কার্যকর রয়েছে। এর আগে ২০১৮ সালের মজুরি বোর্ড অনুযায়ী এই বেতন ছিল মাত্র ৮ হাজার টাকা।

আন্তর্জাতিক আইনের সাথে মিল রেখে শ্রম আইন সংশোধন করায় এখন প্রতি পাঁচ বছরের বদলে প্রতি তিন বছর পর পর নতুন মজুরি বোর্ড গঠনের আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে। সেই অনুযায়ী, চলতি ২০২৬ সালের নভেম্বর মাসের মধ্যেই শ্রমিকদের জন্য পুনরায় নতুন বেতন কাঠামো ঘোষণা করার কথা এবং সরকার ইতিমধ্যেই এর নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

আইন অনুযায়ী প্রতি বছর পোশাক শ্রমিকদের মূল বেতন ৫ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পায়। আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে প্রতি বছর তো শ্রমিকের আয় বাড়ছেই, তাহলে তিন বছর পর পর কেন নতুন বেতন কাঠামোর প্রয়োজন? এর উত্তর লুকিয়ে আছে বাজারব্যবস্থার মূল্যস্ফীতি বা টাকার মান হারানোর ভয়ংকর খেলার মধ্যে।

২০২৩ সালের শেষের দিকে যে পণ্য ১০০ টাকায় পাওয়া যেত, ২০২৬ সালের শেষে এসে সেই একই পণ্য কিনতে খরচ হচ্ছে প্রায় ১৩৬ টাকা। অর্থাৎ, গত তিন বছরে সব মিলিয়ে মোট মূল্যস্ফীতি বেড়েছে ৩০.৪ শতাংশ। আর চলতি বছর শেষে যখন নতুন বেতন কাঠামো ঘোষিত হবে, তখন এই মূল্যস্ফীতি প্রায় ৪০ শতাংশের কাছাকাছি পৌঁছে যাবে। সোজা কথায়, ২০২৩ সালের ১২ হাজার ৫০০ টাকার কেনাকাটার ক্ষমতা এখন ২০২৬ সালের শেষে এসে ১৬ থেকে সাড়ে ১৬ হাজার টাকায় ঠেকেছে।

বার্ষিক ৫ শতাংশ হারে বেতন বৃদ্ধির ফলে তিন বছর শেষে একজন শ্রমিকের ন্যূনতম বেতন বেড়ে দাঁড়ায় ১৪ হাজার ৪৭০ টাকা। কিন্তু বাজারের প্রকৃত হিসাব বলছে ভিন্ন কথা। মূল্যস্ফীতির তীব্র চাপে টাকার মান এতটাই কমে গেছে যে, ৩ বছর আগের তুলনায় পোশাক শ্রমিকের ন্যূনতম মজুরি আসলে গড়ে ২ হাজার টাকা কমে গেছে। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও)-র ১৩১ নম্বর কনভেনশনে একদিকে যেমন শ্রমিকের পরিবার নিয়ে সামাজিকভাবে বেঁচে থাকার ন্যূনতম অধিকারের কথা বলা হয়েছে, অন্যদিকে মালিকপক্ষের স্বার্থও দেখা হয়েছে। 

কিন্তু আমাদের দেশের একজন পোশাক শ্রমিকের ৪ সদস্যের ক্ষুদ্র সংসার চালানোর বাস্তব চিত্রটি অত্যন্ত নির্মম। চারজনের পরিবারে দিনে অন্তত একটি করে ডিম বা মাঝারি আকারের মাছ দিয়ে মোটা চালের ভাত খেতে গেলেও  প্রতি মাসে কেবল খাবার বাবদ খরচ হয়ে যায় ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা। ঢাকা, গাজীপুর বা আশুলিয়ার কলকারখানা ঘেরা অঞ্চলের একটি অস্বাস্থ্যকর, স্যাঁতসেঁতে ও ছোট বদ্ধ ঘরের ভাড়া এবং গ্যাস-বিদ্যুৎ বিল মেটাতেই বাড়িওয়ালার হাতে চলে যায় আরও ৬ থেকে ৮ হাজার টাকা। এর ওপর পরিবারের সদস্যদের অসুস্থতা, চিকিৎসা ও শিশুর স্কুলের খাতা-কলম বা পড়াশোনার ন্যূনতম খরচ যোগ করলে আরও কমপক্ষে ৪ হাজার টাকার প্রয়োজন হয়। সব মিলিয়ে কেবল কোনোমতে নিঃশ্বাসটুকু টিকিয়ে রেখে বেঁচে থাকার জন্যই মাসে এখন প্রায় ২৬ হাজার টাকার প্রয়োজন। ফলে মাত্র সাড়ে ১২ বা ১৩ হাজার টাকা বেতন পেয়ে প্রতি মাসেই শ্রমিকদের ঋণের জালে জড়াতে হচ্ছে।

এই অপর্যাপ্ত বেতনের কারণে বিশেষ করে নারী শ্রমিকেরা এনজিও বা চড়া সুদের মহাজনি কারবারিদের পাতা অন্ধকার জালে আটকা পড়ছেন। প্রতি মাসের সুদের চরম মানসিক চাপ তাদের পারিবারিক ও সামাজিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার কেড়ে নিচ্ছে। এই পরিস্থিতি থেকে বাঁচতে হলে বিদেশি ক্রেতাদের কাছ থেকে জোটবদ্ধভাবে পোশাকের সঠিক ও যৌক্তিক মূল্য আদায় করতে হবে। কারণ, একজন সুস্থ ও পেটভরা শ্রমিক তার কাজে আরো দক্ষতার পরিচয় দেয় ও আনন্দের সাথে কাজ করতে পারেন, যা দিনশেষে মালিকের ব্যবসাকেই লাভবান করে। তাই অধিকারের মেলবন্ধনে শ্রমিকদের সম্মানের সাথে বাঁচিয়ে রাখতে হলে, পুরোনো মজুরির হিসাব ভুলে ২০২৬ সালের নতুন কাঠামোতে ন্যূনতম বেতন ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণ করা এখন সময়ের দাবি।

এই দাবিতে ইতিমধ্যে আশুলিয়া, উত্তরা ও গাজীপুরের শ্রমিকেরা আন্দোলনে নেমেছেন। তাঁদের আন্দোলনে পুলিশের হামলা ফ্যাসিস্ট শাসনামলে সংঘটিত গণতান্ত্রিক আন্দোলনগুলো দমনে রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের সেই পুরোনো চিত্রই আবার সামনে নিয়ে আসে। অথচ এই চিত্র বদলানোর আকাঙ্ক্ষা থেকেই জুলাই অভ্যুত্থানে শ্রমিকেরা সাহসের সঙ্গে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। তাঁদের প্রত্যাশা ছিল, অভ্যুত্থান-পরবর্তী রাষ্ট্রে দাবি আদায়ের জন্য আর পুলিশি হামলা, দমন-পীড়ন কিংবা রাষ্ট্রীয় শক্তির মুখোমুখি হতে হবে না। কিন্তু শ্রমিকদের আন্দোলনে আবারও সেই পুরোনো দমনমূলক আচরণের পুনরাবৃত্তি আমাদের জানান দেয় এই লড়াইয়ের যাত্রা আরো দীর্ঘ।


-- --
লেখকঃ রোকন-উজ-জামান


শেয়ার করুন: