ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধীতা ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

সোহান শরীফ
প্রকাশ: ১৫ অক্টোবর ২০২৬, ১৫:৩৭পরিবর্তন করতে ক্লিক করুন
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধীতা ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
শেয়ার করুন:

যখন মুসলিম আর হিন্দু ছাত্রদের জন্য আলাদা হলের প্রয়োজন হয়, তখন রবীন্দ্রনাথকে মুসলিম ছাত্ররা তাদের হলের ছাত্র সংসদে আজীবন সদস্যপদ প্রদান করে; জগন্নাথ হল নয়। এমনকি পরবর্তীতে, তাকে জগন্নাথ হল আজীবন সদস্য করেছেন এমনটাও শোনা যায় না।

বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ে যেভাবে সমাজের স্তরে স্তরে সাম্প্রদায়িক রাজনীতিতে বিশ্বাসী লোকেদের উত্থান দেখা যাচ্ছে, তাতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও ‘রঠা’ বিতর্ক নিয়ে কথা বলতে গেলে বহুস্তরে বিভক্ত হয়ে আলোচনা করা প্রয়োজন, কিন্তু যেহেতু আমি আসলে সবার বক্তব্যের প্রতিবয়ান করতে বসিনি; তাই আয়াস গং বা জনপ্রিয় ধারার ‘বিপ্লবী’দের বিতর্ক নিয়ে আমি একটা কথাও লিখিনি।

এই সকল ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে ওঠা সংগঠনের রাজনৈতিক চিন্তার তাত্ত্বিকগুরু তথা বর্তমান বাজারে রবীন্দ্র-বিদ্বেষের প্রধান তাত্ত্বিক সলিমুল্লাহ খান এর রবীন্দ্র বয়ান ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা বিরোধীতার আলাপের উপরে আমি আলো ফেলার চেষ্টা করেছি এই লেখায়। কেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধীতা করা হয়েছিল, কারা করেছিল। সেই সকল প্রশ্নের উত্তর তুলে ধরার চেষ্টা করেছি।

 সলিমুল্লাহ খান সাহেব যে বক্তব্য দিয়েছেন সাইরেন আয়োজিত “কেমন বিশ্ববিদ্যালয় চাই?” সেমিনার-এ অথবা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাজবিজ্ঞান অনুষদের অডিটোরিয়ামে আয়োজিত “বাংলাদেশে চলমান ইতিহাসচর্চার সংকট ও সৈয়দ আবুল মকসুদের সাধনা”য় প্রধান বক্তার বক্তব্যে, তিনি যে খন্ডিত ইতিহাস তুলে ধরে ব্যাখ্যা করেছেন; তার প্রেক্ষিতে বস্তুনিষ্ঠ ইতিহাস ও তৎকালীন বাস্তবতা তুলে ধরে “রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এর অবস্থান ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় বিরোধীতা” এর প্রতিবয়ান তুলে ধরার চেষ্টা করছি এই লেখায়।

সলিমুল্লাহ খানের মতে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরোধিতা করে কলকাতায় যে জনসভা আয়োজন করা হয়েছিল ১৯১২ সালে, সেখানে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যোগ দেননি; তবে তিনি সেই সভার বিরোধিতাও করেননি। একারণে, যেহেতু আমরা কোনো প্রমাণ পাইনি, তাই তাকে দোষী দাবি করছি, যদি তিনি দোষ না করেন তবেই তিনি দায় মুক্ত। তার বক্তব্যটা এরকম। কিন্তু পরক্ষণে, তিনি আর সি মজুমদারও সৈয়দ আবুল মকসুদ এর বইয়ের উদ্ধৃতি দিয়ে বলার চেষ্টা করেন, যে রবীন্দ্রনাথ আসলে দায়ী ছিলেন। আর এই অসত্যকে বাংলাদেশের এক শ্রেণীর মানুষ সত্য বলেই ধারণা করা শুরু করছে।

আচ্ছা বলুন তো, সলিমুল্লাহ খান কি সব কিছুতেই তাঁর অবস্থান ঘোষণা করেন? এই যে জুলাইয়ে, এক দফার ঘোষক নিয়ে একটা বিতর্ক হল, এখানে সলিমুল্লাহ খানের বক্তব্য কি? আমি শুনিনি, আমার মতে হাসিনা পতনের ডাক তিনি ইউল্যাবের সামনে ৩০ জুলাই দিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি এই বিষয়ে পরে কোনো বক্তব্য দেন নি, কিংবা দেশে আইন-শৃঙ্খলার যে অবনতি হচ্ছে, সেই বিষয় তার বক্তব্য কি? কিংবা গরু খাওয়া নিয়ে কয়েকদিন পর পর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা যে ভুভুক্ষর মত আচরণ করে, তাতে সচেতন শিক্ষক হিসেবে তিনি কি মতামত জানালেন। যদি দুইশো বছর পর কেউ এ সম্পর্কে বলেন, যে সলিমুল্লাহ খান মূলত এই গরু খাওয়া দলের লোক ছিলেন। তখন কি আমরা বলবো, যে প্রমাণ না পাওয়া পর্যন্ত এটাই সত্য। কেননা, তিনি মনে করতেন বিশ্ববিদ্যালয় এসেছে মাদ্রাসা থেকে। তিনি যেহেতু মুসলিম ছিলেন, যেহেতু তিনি এর প্রতিবাদ করেন নি;  তাই তিনি আসলে ওই দূর্গাপূজার সময়ে গরু-খোর ভুভুক্ষদের দলেরেই ছিলেন। মূলত তার যুক্তিটি এমনই একটা ফ্যালাসির উপর দাড়ানো। 


সলিমুল্লাহ খান কি ভেবে দেখেছেন যে, তাঁর এই ফ্যালাসির কাঠামো তাঁর উপরে প্রয়োগ করলে কেমন হয়? 

সলিমুল্লাহ খানের এই যুক্তির কাঠামো হল, “তিনি কি এ নিয়ে কোনো কিছু বলেছেন? কেন বলেন নি?” আমরা এবার এই ফ্যালাসিরই উত্তর করবো এবং আমরা এই কু-যুক্তিগুলোকেই প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন হিসেবে ধরে নিয়ে হিসেবে ধরে নিয়ে আলোচনা অগ্রসর করবো। প্রথমত, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যদি সত্যি সত্যিই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করতেন, তাহলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম ব্যাচের শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার মাত্র চার বছরের মাথায় ১৯২৫ সালে, তাকে আমন্ত্রণ জানাতো না। এখানে লক্ষ্যনীয়, তিনি ছাত্রদের আমন্ত্রণেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এসেছিলেন সেবছর। এছাড়া তিনি বিভিন্ন সময়ে ছাত্রদের সঙ্গে সংযুক্ত ছিলেন, ম্যাগাজিনে লেখা দিয়েছেন। তবে সবচেয়ে বেশি লেখা দিয়েছেন সলিমুল্লাহ হলকে। 

যখন মুসলিম আর হিন্দু ছাত্রদের জন্য আলাদা হলের প্রয়োজন হয়, তখন রবীন্দ্রনাথকে মুসলিম ছাত্ররা তাদের হলের ছাত্র সংসদে আজীবন সদস্যপদ প্রদান করে; জগন্নাথ হল নয়। এমনকি পরবর্তীতে, তাকে জগন্নাথ হল আজীবন সদস্য করেছেন এমনটাও শোনা যায় না। আরেকটা কথা বলে রাখা প্রয়োজন, তখন হিন্দু-মুসলিম রায়ট চলতো এই বাংলায়। সেই রায়টের বাস্তবতায় একজন অমুসলিম কবি , যিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিষ্ঠার বিরোধী, যাঁকে প্রমাণ করতে চাওয়া হচ্ছে মুসলিম বিদ্বেষী; তাকেই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম ব্যাচের মুসলিম শিক্ষার্থীরা মুসলিম ছাত্রাবাসের আজীবন সদস্যত্ব প্রদাণ করল তাদের স্নাতক শেষ হবার আগেই? আর কবিও তাদের ম্যাগাজিনে নিয়মিত লেখা দিলেন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর থেকেই? কবিকে আজ যেভাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধী এবং মুসলিম-বিদ্বেষী হিসেবে প্রমাণের চেষ্টা করা হচ্ছে, সেখানে কি তাঁর প্রতি সুবিচার করা হচ্ছে? 

এছাড়াও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আরেকবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আসেন ১৯৩৬ সালের সমাবর্তনে। রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র সহ টোটাল ৬জন সেবছর ডি.লিট ও অন্যান্য সম্মানসূচক ডিগ্রি প্রদান করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বাঙ্গালি মুসলিম উপাচার্য স্যার এ এফ রহমান খান ১৯৩৬ সালে। ঢাকা শহরে তখন নিয়মিত সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হয়,কই তখন তো কেউ মব করেনি, বিরোধীতাও করেনি; এমনকি কেউ এমন কথাও বলেনি যে রবীন্দ্রনাথ কেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ডি-লিট পাবেন!

যারা কথায় কথায় রবীন্দ্রনাথকে হিন্দু বলেন, তাদের জানা প্রয়োজন রবীন্দ্রনাথের পিতৃপুরুষ ও মাতৃপুরুষ উভয়ই খুলনায় ছিলেন এবং পিরালী ব্রাহ্মণ ছিলেন। ড. খোন্দকার আলমগীর মতে, “যেসব হিন্দু ব্রাহ্মণেরা খান জাহানের সংস্পর্শে এসে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন তারা পিরালি মুসলমান হিসেবে পরিচিত ছিলেন। …পিরালি মুসলমানদের হিন্দু আত্মীয়-স্বজনরা পিরালি ব্রাহ্মণ হিসেবে পরিচিত হন। তারা ছিলেন পতিত ব্রাহ্মণ (অচ্ছুত)। অন্য হিন্দুরা তাদের সঙ্গে আত্মীয়তা সম্পর্ক করতেন না। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিলেন খুলনা জেলার আলাইপুরের ব্রাহ্মণদের উত্তর-পুরুষ অর্থাৎ কলকাতার ঠাকুর পরিবার ছিল এ পিরালি সম্প্রদায়ের বংশধর। এ কারণে তাঁরা নিজ সম্প্রদায় ছাড়া বিবাহ করতে পারতেন না। কবিগুরুর পিতা মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর খুলনা জেলার ফুলতলার দক্ষিণ ডিহিতে পিরালি পরিবারে বিবাহ করেন।” তাই রবীন্দ্রনাথকেও দক্ষিণ ডিহির পিরালি সম্প্রদায়েই বিবাহ করতে হয়। তাঁর দাদা প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর ব্রাহ্ম সমাজ প্রতিষ্ঠাকালীন সময়ে রাজা রামমোহন রায়কে নানাভাবে সহযোগিতা করেন এবং বিপুল আর্থিক পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান করেন। তার পিতা ব্রাহ্ম ধর্মে দীক্ষা লাভ করেন এবং পরবর্তীতে ব্রাহ্ম সমাজ আন্দোলনের নেতা ও আধ্যাত্মিক চর্চা করেন। মূলত তার হাত ধরেই, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ব্রাহ্ম ছিলেন। পরবর্তীতে ব্রাহ্ম সমাজের মুখপত্র তত্ত্ববোধিনীর সম্পাদনাও করেছেন।

যারা ব্রাহ্ম সম্পর্কে জানেন না, তাদের জন্য সংক্ষেপে বলি, ব্রাহ্ম সমাজ হলো হিন্দুধর্মের অভ্যন্তরে গড়ে ওঠা একটি একেশ্বরবাদী ধর্মীয় আন্দোলন। ১৮২৮ সালে রামমোহন রায় কলকাতায় এই আন্দোলনের প্রতিষ্ঠা করেন। 

ব্রাহ্ম সমাজ বেদের কর্তৃত্ব স্বীকার করে না। অবতারবাদে, অর্থাৎ ভগবান বিষ্ণুই যে রাম ও কৃষ্ণরূপে জগতে আবির্ভূত হয়েছেন, এ ধারণায় তাদের বিশ্বাস নেই। ফলে, কর্মফলবাদ (অতীতের কাজের কার্যকারণজনিত ফল) কিংবা সংসারচক্রে (মৃত্যু ও পুনর্জন্মের প্রক্রিয়া) বিশ্বাস করাও তারা বাধ্যতামূলক মনে করে না; মানুষ মৃত্যুর পর আবার নিম্নশ্রেণির পশু হয়ে ফিরে আসে; এ ধারণারও তারা বিরোধী ছিল। ব্রাহ্ম সমাজ হিন্দুধর্মের বিভিন্ন আচার-অনুষ্ঠান পরিত্যাগ করেছে এবং উপাসনার ক্ষেত্রে খ্রিষ্টধর্মের কিছু রীতিনীতি গ্রহণ করেছে। ইসলাম ও খ্রিষ্টধর্মের প্রভাবে তারা বহুঈশ্বরবাদ, মূর্তিপূজা ও জাতিভেদ প্রথার বিরোধিতা করে। ফলে, শিক্ষিত শ্রেণির মধ্যে প্রভাব ফেললেও এ দেশের সাধারণ হিন্দু তথা সাধারণ মানুষের মধ্যে জনপ্রিয়তা লাভ করেনি। 

শুধু তাই নয়, দেবেন্দ্রনাথের পরিবার তথা জোড়াসাঁকোর ঠাকুর বাড়ির ব্রাহ্মরা হচ্ছেন সেই পর্ষদ, যারা হিন্দু ধর্মীয় কোনো সংস্কারই মানতেন না। অর্থাৎ তাদের সংস্কৃতি আজকের ঢাকা শহরের বাঙ্গালিয়ানা বলতে যা বোঝেন তার কিছুটা, আবার কিছুটা প্রাচীন সমাজের কৃষ্টি, কিছুটা ইসলামি সংস্কৃতির ছোয়া, বৌদ্ধদের প্রতি খানিকটা প্রেম আর চলনে বলনে আধুনিকতায় মানিয়ে নেওয়া মেট্রোপলিটন মানব। সবচেয়ে সহজ উদাহরণ মাথায় আসছে, সংরক্ষিত মহিলা আসনের এম পি নুসরাত তাবাসসুম এর নাম। তিনি টিএসসিতে গ্রামীণ ঐতিহ্যকে ধারণ করে ব্লাউজ বা বক্ষবন্দনী বিহীন শাড়ি পোষাকের স্বাধীনতা নিয়ে প্রতিবাদ করেছেন, নাটক সিনেমাও দেখেন, দীর্ঘকাল টিএসসিতে প্রগতিশীল হিসেবে অর্থ্যৎ প্রতিবাদী কন্ঠস্বর হিসেবে পরিচিত ছিলেন, নারী স্বাধীনতার পক্ষে কথা বলেন আবার জামায়েত জোটের হয়ে এমপিও হয়েছেন। অর্থাৎ বহু সংষ্কৃতির ধারক।

ফলে একদিক থেকে তাদের পূর্বসূরি মূলত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও জোড়া সাকোর ঠাকুর পরিবার। যাকে আপনারা হিন্দু বলছেন, তিনি আদতে হিন্দু নামে বহুধর্ম ও জীবনের সমন্বিত পথের পথিক ছিলেন বলা যায়। ঠাকুর বাড়িতে কোরান পড়া হতো, পড়া হতো সুফী কবি হাফিজের কবিতা। এমনকি রবীন্দ্রনাথ পোশাকের দিক থেকে ভারতীয় পোশাক পরতেন না, তিনি ইরানী পাঞ্জাবি পরতেন, আর বিনয়ে ছিলেন বৌদ্ধদের মতো।

তবে তার চিন্তাকে আখ্যায়িত করা হতো, উপনিষদের বিশ্বজনীনতা বা উপনিষদিক ইউনিভার্সালিজম নামে। এখানে বলে রাখি বাংলা ভাষায় রবীন্দ্রনাথকে কবি, কথাসাহিত্যিক, গীতিকার, সুরকার, জমিদার হিসেবে দেখা হলেও তার দার্শনিক পরিচয়টি সেভাবে আলোচিত নয়, কিন্তু বর্হিবিশ্বে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কবি এবং দার্শনিক।

এতোক্ষণ আলোচনার পর, আপনার প্রশ্ন জাগতে পারে, রবীন্দ্রনাথের সাথে তাহলে সলিমুল্লাহ খান, পিনাকী, ইলিয়াস ও তাদের অনুসারীদের সংঘাত কোথায়? সহজভাবে বললে, পিনাকী ভট্টাচার্য ব্রাহ্মণ কিংবা হিন্দু হওয়া সত্ত্বেও তাকে তার স্বগোত্রীয় পরিচয়ে মৌলবাদীরা পছন্দ করে, মসজিদে প্রজেক্টরে তার ভিডিও দেখে; আর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর হয়ে ওঠেন রঠা। যদিও মত প্রকাশের স্বাধীনতার জন্য তিনি ফ্রান্সের ভিসা পেয়েছিলেন, মৌলবাদ ও রাষ্ট্রীয় হুমকির কারণে অভিবাসী হওয়া, পিনাকী হচ্ছেন এদেশের মৌলবাদীদের প্রিয়পাত্র। আর রঠা হয়ে গেলেন গোড়া হিন্দু। অথচ তিনি হিন্দু না হতে পারার দরুণ বিয়ে করার মতো মেয়ে পাচ্ছিলেন না। এমনকি এটাও সত্য যে ভবতারিনী কে তিনি প্রথমে পছন্দ না করায় তাকে দ্বিতীয়বার সড়কপথে দক্ষিণদিহি নেওয়া হয় শোনা যায়, একই কন্যাকে দেখাতে। বিয়ের পর তিনি আর কোনোদিন শ্বশুরালয়ে যাননি। এতো গেল তার জীবন যাপনের কথা, তার কর্মকান্ডের ফিরিস্তিও কিছুটা বলি।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর পাঞ্জাবের জালিওয়ানালা বাগে ব্রিটিশ ইংরেজ বাহিনী পহেলা বৈশাখের উৎসবে নির্বিচারে গুলি চালায়। ইতিহাসে যা মূলত জালিওয়ানালাবাগ গণহত্যা নামে পরিচিত। এই নারকীয় গণহত্যায় ১৫০০ সাধারন ভারতীয় নাগরিক যাদর মধ্যে বহু মুসলিম নিহত হন এবং দুই হাজারের অধিক মানুষ আহত হন। এই গনহত্যার প্রতিবাদে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর একাই ব্রিটিশ রাজার দেওয়া নাইটহুড পদক ত্যাগ করেন, নাইট উপাধি ত্যাগ করায় রবীন্দ্রনাথ রাতারাতি হিন্দু-মুসলিমসহ সকল ধর্ম, শ্রেণি, পেশার মানুষের শ্রদ্ধার পাত্র হয়ে ওঠেন। কারণ নাইটহুড প্রত্যাখ্যান করা মানে ব্রিটিশ রাজাকে অপমান করা। যা মূলত সরাসরি ইংরেজ শাসকের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের শামিল। তবুও রঠা কেন খারাপ? কারণ একটাই, তিনি ওহাবি মুসলিম তথা সুন্নি মুসলিমের চিন্তা ধারণ করেননি, চর্চা করেননি। তিনি সুফি মুসলিমের চিন্তাকে ধারণ করতেন। যারা বলেন যে তার সাহিত্যে মুসলমান নেই, তাদের জ্ঞাতার্থে বলি মৃত্যুর মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগেও তিনি একটি গল্প লেখেন মুসলমানীর গল্প নামে। সেখানে তিনি দেখান, যে একজন হিন্দু মেয়ে কমলাকে তার আত্মীয় স্বজন পছন্দ না করলেও মুসলমানের কাছে তিনি জায়গা পান, তার জন্য তার জাত যায়না বরং মুসলমান বাড়িতে বসেও সে তার স্বধর্ম ও গোত্র ধারণ করে মেয়ের মতো মর্যাদা পায় এবং তাকে তার সমাজ পত্যাখ্যান করলেও মুসলমান সমাজ গ্রহণ করে। এমনকি তারই আরেক চাচাতো বোন যার পরিবার কমলাকে তাড়িয়ে দিয়েছিল তার বিপদে কমলা ও তার স্বামী এগিয়ে যায়।

শুধু তাই নয়, ১৯৩২ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ইরানের কবি হাফিজ শিরাজী কবরের সামনে হাঁটু গেড়ে বসে কেঁদেছিলেন এবং এই সফরের নাম দিয়েছিলেন কবি তীর্থযাত্রা। তীর্থে কেন যায়, কখন যায় সবই জানেন।

একজন একাত্তর বছর বয়সী বৃদ্ধ অসুস্থ অবস্থায় তীর্থ বলতে একজন মুসলমান কবির কবর দর্শনে যাচ্ছেন। ১৯৩২ সালের হিন্দু মুসলিম রায়টের সময় এটা সহজ বিষয় ছিলো না। ইংরেজ সরকার রবীন্দ্রনাথকে ‍হুমকিস্বরূপ মনে করতেন। আর তাঁর কাজও তেমনই ছিল তার একটি উদাহরণ দেই।

নানান ব্যবসায়ে আর্থিক ক্ষতির কারণে, বিশ্বভারতী তৈরি করার জন্য যথেষ্ট পরিমাণ অর্থ ছিলো না। যেহেতু নোবেল পুরস্কারের টাকা ইতিমধ্যেই কুষ্টিয়ায় সমবায় সমিতির সদস্যদের ঋণ দিয়ে আর ফেরত পাননি, ফলে তিনি আসলেই অর্থকষ্টে পড়েন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে। ষাটোর্ধ্ব বৃদ্ধ রবীন্দ্রনাথ জাপান, আমেরিকাসহ বিভিন্ন দেশে ও বিশ্ববিদ্যালয়ে বক্তৃতা করেছিলেন, কিছু অর্থ উপার্জনের আশায়, যা দিয়ে শেষ পর্যন্ত বিশ্বভারতী তৈরি হল।

এখন প্রশ্ন জাগতে পারে, বিশ্বভারতী কেন ইংরেজদের কাছে অপছন্দের ছিল?

মানচিত্রে দেখলে বুঝবেন, বিশ্বভারতী কোনো শহরের বিশ্ববিদ্যালয় নয়, একদম বীরভূমের গ্রামের দিকে তৈরি হয়েছে এবং সেখানে গ্রামের ছেলেদের পড়ানো হতো এমনকি প্রথম ব্যাচেই মুসলিম-হিন্দু মিলিয়েই ছাত্র ভর্তি করানো হয়েছিল। ব্রিটিশ সরকারের অর্থ সহায়তা যেমন নেন/পায় নি, তেমনি তিনি ইংরেজদের তৈরি করা সিলেবাসও পড়াতে বাধ্য ছিলেন না অর্থাৎ কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিলেবাস বিশ্বভারতীতে পড়ানো হতো না। কিন্তু মেয়েদের শেখানো হতো মার্সাল আর্ট, ছেলেদের কুস্তি, লাঠি খেলা, শরীর চর্চা করানো হতো। যাকে ‍ইংরেজরা সন্দেহের নজরেই দেখতো। এমনকি তিনি মেয়েদের মার্সাল আর্ট প্রশিক্ষণের জন্য জাপান থেকে প্রশিক্ষক এনেছিলেন। এহেন কর্মকান্ড আার রবীন্দ্রনাথের লেখায় একটা প্রচ্ছন্ন হুমকি মনে করতো ইংরেজরা, কিন্তু নোবেলজয়ী হওয়ায় ব্যান করতে পারতোনা, সবমিলিয়ে তখন ইংরেজরা বিশ্বভারতীকে হুমকিস্বরূপ মনে করল।

তাই বিশ্বযুদ্ধের অজুহাতে সাত বছর ধরে ফেলে রাখা অগুরুত্বপূর্ণ ফাইলটাকে তারা তড়িঘড়ি করে ওপেন করল। কেন করল জানেন? কারণ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মুর্শিদাবাদের কাছে বীরভূমের বোলপুরে ১৯১৮ সালের ২৪ ডিসেম্বর বিশ্বভারতীর ভবন নির্মাণের কাজ উদ্বোধন করেছেন, ফলে বোঝা যাচ্ছিল যে বাংলাতে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিপরীতে আরেকটি বিশ্ববিদ্যালয় হয়েই যাচ্ছে।

এখানে হুমকি শুধু একটা নয় যে শিখিয়ে পড়িয়ে বিপ্লবী বানাবে বরং মুর্শিদাবাদের কাছাকাছি যদি একটা বিশ্ববিদ্যালয় হয়, তাহলে মুঘল আমলের সমৃদ্ধশালী ঐতিহ্যবাহী বাংলার রাজধানী মুর্শিদাবাদ ছাইয়ের আগুন থেকে আবার জলে উঠতে পারে। এছাড়াও তখন ভারতবর্ষের বিভিন্ন স্থানে ইংরেজদের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষ জেগে উঠছিল, তাই হুমকি ছিল বহুমাত্রিক।

তখন রাজনৈতিক অস্থিরতা কমিয়ে প্রজাদের ঠিকমতো শাসন করতে বাংলার জমিদার ও রাজনৈতিক নেতাদের খুশি রাখার বিষয়টি প্রাধান্য দিয়ে দেখা হয়। নওয়াব আলী চৌধুরীসহ কয়েকজন জমিদারকে খুশি রাখতে নাথান কমিশনের দেওয়া প্রতিবেদনের চার বছর পর বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় শুধু মনোযোগই দেয়নি প্রথমবারের মতো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে গড়ে তোলা হয়।


তবে বিশ্ববিদ্যালয় তৈরিতে বড্ড বেশি তাড়াহুড়ো করে বিধায়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য স্থান নির্ধারণ করে উঠতে পারেনি। বিশ্ববিদ্যালয়কে দেওয়া হলো কার্জন হল। যা মূলত তখন ঢাকা কলেজকে দিয়েছিলো ইংরেজ সরকার। আর ঢাকা কলেজকে স্থানান্তরিত করা হল পুরাতন হাই কোর্ট ভবনে। ব্রিটিশ সরকারের প্রশাসনিক কর্মকান্ড পরিচালনা করার জন্য যে জমি নির্ধারণ করেছিলো তাও দিয়ে দেওয়া হল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে। এখানে নওয়াব সলিমুল্লাহর আলাপ চলে আসে, যে তার জমিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত। কথা হচ্ছে তার জমিটা কোথায়? এক বাক্যে বললে নওয়াবি এস্টেটের খাজনা ঠিকমতো পরিশোধ করতে না পারায়, রমনাকে খাস জমি হিসেবে ঘোষণা করা হয়। এবং সেখানে প্রাদেশিক রাজধানী করার পরিকল্পনাও করা হয়। তখন নওয়াবের ইংরেজদের জমি দানের বিষয় আসে না, আসে শুধু শুধু বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করলে! যাই হোক, অফিসিয়ালি ঢাবি তৈরি হয়েছিল ইংরেজ সরকারের নির্ধারণ করে দেওয়া সরকারি জমিতে, যার পরিমাণ ছিল হয়তো ৬০০ একর। ঢাবি ও রবীন্দ্রনাথের মধ্যে বিতণ্ডা তাহলে কোথায়?

ঢাবি খুব তাড়াতাড়ি ছাত্র ভর্তি নিয়ে ক্লাস শুরু করে আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে, কিন্তু সিলেবাস অনুসরণ করে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের থেকে ধার করা। যেখানে রবীন্দ্রনাথ বানাচ্ছিলেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিপরীতে ভারতের প্রাচীন বিহার সদৃশ আশ্রমধর্মী বিশ্ববিদ্যালয়। ফলে কাছাকাছি স্থানে দুটি আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় তৈরি করা হল। একটি ঔপনিবেশিক বিশ্ববিদ্যালয়, আরেকটি বিউপনিবেশিত বিশ্ববিদ্যালয়। এক্ষেত্রে শুধু রবীন্দ্রনাথ নয়, যেকোনো রাজনীতি-সচেতন মানুষই চাইবে, সিলেবাস পরিবর্তন হোক, পড়ানো হোক প্রয়োজনীয় জ্ঞান; যা মূলত বিউপনিবেশিক বিশ্ববিদ্যালয় চেয়ে থাকে। এখানে বিশ্বভারতী মূখ্য ছিলনা। মূখ্য ছিলো আরেকটি প্রতিষ্ঠান। তাদের সম্পর্কে বলার আগে বলা প্রয়োজন কারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরোধীতা করেছিলেন? ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরোধীতাকারীদের নাম বললে সর্বার্গে উঠে আসে তিনি হলেন সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জি। পেশায় তিনি ছিলেন রাজনীতিবিদ, রিপন কলেজের শিক্ষক ও প্রাক্তন আইএএস অফিসার। তিনি লর্ড হার্ডিঞ্জ এর কাছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরোধীতা করে স্মারকলিপি দিয়েছিলেন। কেন দিয়েছিলেন জানেন? সুরেন্দ্রনাথ, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, অরবিন্দ ঘোষসহ তৎকালীন বঙ্গভঙ্গ বিরোধীরা, ডন সোসাইটির সতীশচন্দ্র মুখোপাধ্যায়, রাস বিহারী ঘোষ ও অন্যান্যদের প্রচেষ্টায় ১৯০৬ সালে গঠিত হয় 'ন্যাশনাল কাউন্সিল অব এডুকেশন' (জাতীয় শিক্ষা পরিষদ)। আজকের বিখ্যাত যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় মূলত জাতীয় শিক্ষা পরিষদের বর্ধিত রূপ। এই পরিষদ মূলত শিমলা শিক্ষা সম্মেলন এর প্রস্তাবনার বিরোধীতা করে, যা মূলত কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় আইন তথা ভারতীয় বিশ্ববিদ্যালয় আইন নামে পরিচিত। যেটি মূলত কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়কে আরো বেশি ঔপনিবেশিক করে তোলার আইন। এমনকি এই কমিশনের আইনের ফলে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেটে আরো বেশি সংখ্যক ইংরেজকে যুক্ত করা এবং উপাচার্য হিসেবে ইংরেজের নাম প্রস্তাবকে তরান্বিত করতো। এই প্রস্তাবের বিরোধীতা করায় এবং ১৯০৬ সালে জাতীয় শিক্ষা পরিষদ একাডেমিক কার্যক্রম পরিচালনা শুরু করলে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় আইন পরিবর্তন না করলেও, আশুতোষ মুখার্জিকে উপাচার্য হিসেবে নিযুক্ত করেন। কিন্তু অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে সেই ভারতীয় বিশ্ববিদ্যালয় আইন বলবৎ থাকে, যার দরুণ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম উপাচার্য কোনো বাঙ্গালি নন। শুধু তাই নয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নিজে কোনো সিলোবাসও তৈরি করেনি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়ে মূলত কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুনরাবৃত্তিই করতে থাকে। যা আঁচ করতে পেরে জাতীয় শিক্ষা পরিষদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরোধীতা করেন। আর সি মজুমদার বা সৈয়দ আবুল মকসুদ সহ অন্যান্যরা যে নামগুলো উল্লেখ করেছেন, তার মূলত স্বদেশী আন্দোলনের কর্মী ও জাতীয় শিক্ষা পরিষদের সদস্য। কিন্তু রাজনৈতিক পরিচয় ছাড়া শুধু নাম বললে শুনতে অপরাধী অপরাধী শোনায়। আর এ কাজটাই করেছেন তারা। ছাড়াও আরো কিছু কারণ আছে। সেগুলো পরে বলছি। আপনারা অভিযোগ নিয়ে আসলেন যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছেন। কেননা, তিনি নাকি বলছেন মূর্খের দেশে আবার কিসের বিশ্ববিদ্যালয়!

এখন একটা সহজ কথা বলেন, শিক্ষিত মানুষ বাড়লেই তো রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বই পড়ার মতো শিক্ষিত সমাজ তৈরি হবে, রবীন্দ্রনাথের কদর আরো বেশি মানুষ বুঝবে। অশিক্ষিত থাকলে কার ক্ষতি? আশাকরি বুঝতে পারছেন। না পারলে বলি, রবীন্দ্রনাথ কথাটি সাধারণ হিসেবে বলেন নি, বলেছেন কটাক্ষ করে। যে জাতির মানুষ শিক্ষিত হয়েও উপনিবেশিক থাকতে চায়, তার শিক্ষিত হওয়া আর অশিক্ষিত থাকা একই কথা। যাই হোক, যদি না বুঝে থাকেন তাহলে আপনার বোঝার দরকার নেই।

এবার আসেন সলিমুল্লাহ সাহেবের কথায়—কেন রবীন্দ্রনাথ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করার সভায় গেলেন, কিংবা কেনই বা এর প্রতিবাদ করলেন না?

সলিমুল্লাহ সাহেব প্রশ্ন তুললেন, কিন্তু উত্তর দিলেন না। আমি অল্প কথায় সেই উত্তরটা দিই:

ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় হলে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাজেট কমে যাবে। এজন্য প্রতিবাদ জানিয়েছিল স্যার আশুতোষ মুখার্জিসহ কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষক। আমার প্রশ্ন হল তাতে রবীন্দ্রনাথের কী? তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেউ ছিলেন? লাভ-লোকসানের হিসাবতো করবেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদেরা। তাই স্যার আশুতোষ মুখার্জিরা বিরোধীতা করেছেন।

সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জি ও জাতীয় শিক্ষা পরিষদ কেন বিরোধিতা করেছিল। আগেই বলেছি তারা মূলত ভারতীয় বিশ্ববিদ্যালয় আইন ও শিমলা শিক্ষা সম্মেলন বিরোধী। মূলত এরাই হচ্ছেন স্বরাজ আন্দোলনের মূখ্যব্যক্তিত্ব। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর স্বরাজ ছিলেন না। কেন ছিলেন না, সেটা আরেক আলাপ। তাহলে এখানেও রবীন্দ্রনাথ যুক্ত নন।

এবার আসেন কলকাতায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরুদ্ধে করা জনসভা নিয়ে। সভাটি হয় ১৯১২ সালে যখন রবীন্দ্রনাথ একজন কবি। মহান কেউ নন। কবিতার বই কিছু মানুষ মূলত নারীরা বাংলা পড়েন। পুরুষরা তো তখন ইংরেজি পড়ে। আর রবীন্দ্রনাথ তখন ইংরেজি লেখেন না। তাই যদি কোথাও লেখা থাকে, যে দেশের বিদ্বজ্জনেরা এখানে বক্তৃতা করবেন, তাহলে আপনি-আমি ১০০ বছর পর ধরেই নেবো অবধারিতভাবে রবীন্দ্রনাথ অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। কিন্তু ১০০ বছর আগে যখন তিনি নোবেল পাননি, তখন রবীন্দ্রনাথকে ততটা গুরুত্বপূর্ণ মনে করা হতো না। একারণেই তিনি নোবেল পুরস্কার পেয়ে ওই কথাগুলো বলেছিলেন। এমনকি, জাতীয় শিক্ষা পরিষদ যার কথা আমি উল্লেখ করেছি, সেখানেও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর খুব একটা গুরুত্ব পেতেন না বলেই মত বিনয় সরকারের। কেননা তখন, আরো অনেক বাঘাবাঘা ইংরেজিতে দক্ষ পণ্ডিত ছিলেন কলকাতায়।

সলিমুল্লাহ খানের দাবী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর স্বদেশী আন্দোলনের চিত্তরঞ্জন দাশের মৃত্যুতে তিনি তেমন কিছু লেখেন নি, মাত্র চার লাইনের কবিতা লিখেছেন। এখানো কথা হচ্ছে, রবীন্দ্রনাথ তো স্বদেশী ছিলেন না। তিনি স্বরাজ ছিলেন সত্য, কিন্তু স্বদেশী আন্দোলনে ছিলেন না। স্বদেশী আন্দোলনকে যদি বিউপনিবেশায়ন ধরে দেখেন, তাহলে পরিস্কার হবে।

মানুষ মনে করে তিনি বিউপনিবেশায়ন এর কথা বলেন মানি, তিনি এন্টি কলোনিয়াল, বিষয়টা কিন্তু মোটেও এমন নয়। তিনি বিউপনিবেশিত মানে হচ্ছে তিনি প্রি-কলোনিয়াল, কলোনিয়াল, এন্টিকলোনিয়াল ও পোস্ট-কলোনিয়াল এবং ডিকলোনিয়াল। অর্থ্যাৎ তিনি সবটাই ধারণ করেন তার নিজের স্বার্থে। রবীন্দ্রনাথ মূলত ছিলেন বিউপনিবেশিত। তাই তিনি সবটাকেই এক মনে করতেন। তিনি ভেদ করেন নি। আর এতেই তিনি দোষী হয়েছেন। সৈয়দ আবুল মুকসুদ কিংবা আর সি মজুমদার মূলত এই চিন্তার ভেদটাই ধরতে পারেন বলে লিখেছেন রবীন্দ্রনাথকে বিরোধী হিসেবে, আর আমাদের সর্বশাস্ত্রবিদ ‍সেই লেখা পড়ে ভুল পাঠ করেছেন। আর একটি জাতিকে সেই ভুলটাই গিলিয়েছেন।

এসব কারণে, তখনকার রবীন্দ্রনাথের এই সভায় যোগ দেওয়া বা না-দেওয়া একই কথা।

যেমন, আমি যদি কাল বলি আইন-শৃঙ্খলার অবনতি হচ্ছে ও সবাই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বিরোধিতা করছে, সেখানে সলিমুল্লাহ খানের অবস্থান কী? তখন সলিমুল্লাহ খান যদি বিশাল বক্তব্য দেন বা না দেন তাতে, রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী থোড়াই কেয়ার করে। এখন আমি যদি বলি না, তাও তিনি কেন প্রতিবাদ করলেন না। তখন তার উত্তর এটাই আসবে, “আমি যদি শিক্ষা নিয়ে কিছু বলি তাকে গুরুত্ব দেবে, কিন্তু আইনশৃঙ্খলার আমি কী বুঝি!” রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৯১২ সালে নোবেল পাওয়ার আগে এই মানুষটাই ছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয় ফেল একজন অখ্যাত কবি, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রম কিংবা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, আইন, সিনেট এসবের কী বোঝেন? তাঁর প্রতিষ্ঠার পক্ষে থাকা আর না থাকা একই কথা।

তথ্যসূত্র:

১. বিনয় সরকার, বিনয় সরকারের বৈঠকে ১ম খন্ড

২. বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা

৩. সলিমুল্লাহ খান, এমএসআই খান ইউটিউব।



-- --

লেখক: সোহান শরীফ

লেখক ও গবেষক

শেয়ার করুন: