মার্কিন বানিজ্য চুক্তি ও কর্জ করে ঘি খাওয়ার মহোৎসব


কার্টুনঃ এআই
চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি হতে পারে ৩৮ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন, ৩.২ শতাংশ। বিপরীতে মূল্যস্ফীতি বেড়ে ১০.৯ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। দেশের অর্থনীতির এমন বেহাল দশায় যুক্তরাষ্ট্র থেকে উচ্চমূল্যের গম, সয়াবিনসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্য, উড়োজাহাজ, প্রাকৃতিক গ্যাস ইত্যাদি আমদানিকে শুধু গোদের ওপর বিষফোঁড়া বললে যথার্থ হয়না; কথা সাহিত্যিক প্রয়াত হুমায়ুন আহমেদের ভাষায় বলতে হয় ’গোদের ওপর ক্যানসার’।
একের পর এক উচ্চমূল্যের আমদানি চুক্তি করে সরকার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, বিশ্বব্যাংক, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)সহ বিদেশী ও আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ‘সাহায্য’ (পড়ুন ভিক্ষা) পেতে মরিয়া হয়ে উঠেছে।
গণমাধ্যমের সাম্প্রতিক খবরে দেখা যায়, সরকারের বিশাল অংকের রাজস্ব ঘাটতি মেটাতে এবং উন্নয়ন প্রকল্পে অর্থায়নের জন্য বিভিন্ন উৎস থেকে ১,৮০০ কোটি থেকে ১,৯০০ কোটি মার্কিন ডলার ঋণ পাওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছে। এর মধ্যে প্রায় দেড় হাজার কোটি ডলার আশা করা হচ্ছে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের কাছ থেকে।
এদিকে আইএমএফ- এর পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি হতে পারে ৩৮ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন, ৩.২ শতাংশ। বিপরীতে মূল্যস্ফীতি বেড়ে ১০.৯ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। দেশের অর্থনীতির এমন বেহাল দশায় যুক্তরাষ্ট্র থেকে উচ্চমূল্যের গম, সয়াবিনসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্য, উড়োজাহাজ, প্রাকৃতিক গ্যাস ইত্যাদি আমদানিকে শুধু গোদের ওপর বিষফোঁড়া বললে যথার্থ হয়না; কথা সাহিত্যিক প্রয়াত হুমায়ুন আহমেদের ভাষায় বলতে হয় ’গোদের ওপর ক্যানসার’।
বুধবার সকালে ব্যাংককে যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বিভাগের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের বৈঠক শেষে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বাংলাদেশের সাংবাদিকদের বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের অগ্রগতির পরিপ্রেক্ষিতে দেশটির কাছ থেকে বাংলাদেশের আরও সহায়তা পাওয়া উচিত। বিগত দিনে আমরা যুক্তরাষ্ট্র থেকে তেমন কিছু পাইনি। কিন্তু বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক যেভাবে এগিয়েছে, তাতে আমরা যুক্তরাষ্ট্র থেকে অনেকগুলো এয়ারক্রাফট কিনছি, তেল, সয়াবিনসহ বিভিন্ন পণ্য ও কমোডিটি আমদানি করছি। তাই তাদের কাছ থেকে আমাদের জন্য বাড়তি সহায়তা আসা উচিত। তারা এ বিষয়ে একমত হয়েছে। আমরা তাদের জোর দিয়ে বলেছি, বাংলাদেশ যখন যুক্তরাষ্ট্র থেকে এত বেশি আমদানি করছে এবং দুই দেশের সম্পর্ক যেখানে এসে দাঁড়িয়েছে, এখন যদি যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে এই সমর্থন না আসে, তাহলে আর কবে আসবে? আমরা যে সহায়তাগুলো আশা করছি, সেগুলো এখন আসা উচিত।’
সরকার কম দামের উৎস থেকে গম-সয়াবিন, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) ইত্যাদি আমদনি কমিয়ে যুক্তরাষ্ট্র থেকে উচ্চমূল্যে এসব পণ্য আমদানি শুরু করেছে। ইতোমধ্যে ২৫-৩০ শতাংশ বেশী মূল্যে প্রতিবছর সাত লাখ টন মার্কিন গম কেনার নিশ্চয়তা দিয়েছে বাংলাদেশ সরকার। এবছর ৬৬০,০০০ টন গম আমদানি প্রক্রিয়া প্রায় সম্পন্ন। বেসরকারি খাতে ১০০ কোটি ডলারের সায়াবিন আমদানির চুক্তিও হয়েছে মার্কিন সয়াবিন এক্সপোর্ট কাউন্সিলের সাথে। এর সাথে ধাপে ধাপে যুক্ত হবে উচ্চ মূল্যের তুলা ও ঔষধ শিল্পের কাঁচামাল এবং আগামী ১৫ বছরে অন্তত ১,৫০০ কোটি ডলার মূল্যের এলএনজি।
এখানেই শেষ নয়। উচ্চমূল্যের আমদানি মিছিলে যুক্ত হয়েছে বোয়িং কোম্পানির উড়োজাহাজ। বিশটি উড়োজাহাজ নিয়ে প্রতিবছর লোকসান দেওয়া সরকারি সংস্থা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের জন্য ২৫টি মার্কিন বোয়িং কেনার চুক্তিও করে ফেলেছে সরকার বাহাদুর। প্রথম দফায় গত ৩০ এপ্রিল ৩৭০ কোটি ডলারে যুক্তরাষ্ট্রে বোয়িং কোম্পানির ১৪টি উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি সই করে। এরপর সরকারের মনে হলো, নাহ্, মাত্র ১৪টি কিনলে কি হয়! আমাদের আরও মার্কিন উড়োজাহাজ চাই। কালবিলম্ব না করে ২৩ সেপ্টেম্বর, নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে, আরও ১১টি বোয়িং কেনার সম্পূরক চুক্তি সই করে ফেলে। যদিও বাংলাদেশের সরকার ওই ১১টি উড়োজাহাজের ক্রয়মূল্য বা চুক্তিমূল্যের খবর আজ পর্যন্ত গোপন রাখতে সক্ষম হয়েছে।
বাংলাদেশের উড়োজাহাজ কেনার এমন উৎসব দেখে ইউরোপীয় ইউনিয়ন চুপচাপ বসে থাকতে পারেনি। তারাও আবদার করে বসেছে, তাদের কাছ থেকে অন্তত ১০ খানা এয়ারবাস কিনতেই হবে। বাংলদেশও কালবিলম্ব না করে গত ৭ অক্টোবর বিমান বাংলাদেশের জন্য ইউরোপীয় নির্মাতা এয়ারবাস এর সাথে ২০০ কোটি মার্কিন ডলার মূল্যে ১০টি উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি করে ফেলে।
যে সংস্থা একের পর এক রুট বন্ধ করে দিয়ে বার্ষিক লোকসান কমাতে মরিয়া এবং মাত্র ২০টি উড়োজাহাজ পরিচালনা করতে হিমশিম খাচ্ছে, তার জন্য রাতারাতি ৩৫টি উড়োজাহাজ কেনার উদ্যোগ কতটা অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক বিবেচনায় যৌক্তিক, তা নূন্যতম স্বাভাবিক বোধ-বুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ মাত্রই বুঝবেন।
সরকারের এসব আমদানি যে কেবল বাজেট ঘাটতি ও বৈদেশিক মুদ্রার মজুদ কমাচ্ছে, তা নয়, অভ্যন্তরীণ বাজারে অস্বাভাবিক মূল্য স্ফীতিও মারাত্মক প্রভাব ফেলেছে। একটি ছোট উদাহরণ দিলে এর প্রভাবের মান মাত্রা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যাবে। মার্কিন গমের প্রথম দুই চালান বাংলাদেশের বাজারে ঢুকতে না ঢুকতেই দেশের আটা-ময়দার মূল্যের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি ঘটে। বান, যার জনপ্রিয় নাম বনরুটি, দেশের শ্রমজীবী মানুষসহ স্বল্প আয়ের মানুষ ও শিক্ষার্থীদের মাঝে ব্যাপক জনপ্রিয়। রাস্তার পাশে এমন কোন টং দোকান পাওয়া যাবে না, যেখানে এই বনরুটি বিক্রি হয় না। এই বনরুটি দুই মাস আগেও ঢাকার টং দোকানগুলোতে ১০ টাকায় বিক্রি হতো। যা এক লাফে ৫০ শতাংশ বেড়ে ১৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের সাত লাখ টন গম বাংলাদেশের মোট চাহিদার মাত্র ১০ শতাংশ হওয়া সত্যেও বাজারে তার প্রভাব কতটা তীব্র, সেটি ‘বনরুটি’র মূল্য বৃদ্ধির উদাহরণে স্পষ্ট। তবে এর শতভাগ ক্রেডিট যুক্তরাষ্ট্রের গম নিতে পারেনি। বেশ খানিকটা এ দেশের বড় বড় আটা-ময়দা ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেট ও বিশেষ ক্ষেত্রে নিষ্ক্রিয় সরকার বাহাদুরও এর সহিহ্ দাবিদার।
একইভাবে নিয়মিত লসে থাকা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের জন্য ৩৫টি উড়োজাহাজ কেবল সংস্থাটির জন্যই বোঝা নয়, বরং আগামী অন্তত ৫০ বছরের জন্য সরকারি ভর্তুকির স্থায়ী ‘বন্দোবস্ত’। স্বাভাবিক নিয়মেই মার্কিন সয়াবিন দেশের বাজারে ভোজ্যতেলের মূল্য বাড়িয়ে দেবে। তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস ও পেট্রোলিয়াম গ্যাস প্রথমে বাড়াবে দেশের প্রাথমিক জ্বালানির দাম, পরে বাড়াবে বিদ্যুৎসহ সকল নিত্যপ্রয়জনীয় পণ্যের দাম। পণ্য মূল্য বৃদ্ধির পাশাপাশি কমবে টাকার মান, নিঃস্ব হবে সাধারন মানুষ।
এসব বিচ্ছিন্ন চুক্তিসমূহের গোড়ায় অবশ্য বেশ শক্ত-পোক্ত একখানা চুক্তি রয়েছে। বাংলাদেশের বিগত অন্তবর্তী সরকার ক্ষমতা ছাড়ার মাত্র কয়েকদিন আগে ৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে প্রকৃতই একটি চিরস্থায়ী ’দাসখত’ চুক্তি স্বাক্ষর করে যায়। বাংলাদেশের পক্ষে ওই চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন সেই সরকারের বানিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশির উদ্দিন এবং জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমান। পরবর্তী নির্বাচিত সরকার চুক্তির শর্তসমূহ যাচাইয়ের যেমন কোন উদ্যোগ নেয়নি, তেমনি একটি অনির্বাচিত সরকারের দীর্ঘমেয়াদী চুক্তি করার এখতিয়ার নিয়েও কোন ধরনের উচ্চবাচ্চ করেনি। বরং কোন কোন ক্ষেত্রে চুক্তির চাহিদার অতিরিক্ত সুবিধা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে দেওয়ার ক্ষেত্রে মরিয়া। ১৪টি বোয়িং উড়োজাহাজ কেনার চুক্তির পর আরো ১১টি কেনার চুক্তি করা তার একটি উদাহরণ। আর দৃশ্যত এই নির্বাচিত সরকারকে মার্কিন আনুগত্যের বলয়ে রাখাবার জন্যই হয়ত অন্তবর্তী সরকারের নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমানকে পররাষ্ট্র মন্ত্রী করা হয়।
ইউনাইটেড স্টেটস রেসিপ্রোকাল ট্রেড ডিল- এ স্বাক্ষরের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ যেসব বাধ্যবাধকতার মধ্যে পড়েছে তার একটি সংক্ষিপ্ত তালিকা নিচে দেওয়া হলো-
• বাংলাদেশ কোন দেশ থেকে কি পণ্য আমদানি করবে কিংবা কোন দেশে কি পণ্য রপ্তানি করবে তা নির্ভর করবে ওই দেশের সাথে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যিক সম্পর্কের ওপর।
• মার্কিন শিল্প ও কৃষিপণ্যের জন্য বাংলাদেশের বাজার উন্মুক্ত করা এবং কোন কোন ক্ষেত্রে আমদানির বাধ্যবাদকতা। এসব পণ্যের মধ্যে রাসায়নিক, যন্ত্রপাতি, মোটরযান, ওষুধ, সয়াবিন, গম, দুধ, মাংস ইত্যাদি রয়েছে ।
• ৩৫০ কোটি ডলার মূল্যের কৃষিপণ্য (গম,সয়াবিন,তুলা,ভুট্টা) এবং ১৫ বছরে ১,৫০০ কোটি ডলার মূল্যের জ্বালানি পণ্য কেনার প্রতিশ্রুতি ।
• মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উড়োজাহাজ (বোয়িং) কেনার প্রতিশ্রুতি ।
এছাড়া, ওই চুক্তির আওতায় যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি করা প্রায় সাড়ে ৪ হাজার পণ্যে শুল্কমুক্ত সুবিধা দিতে হবে। আগামী পাঁচ থেকে দশ বছরের মধ্যে আরও ২ হাজার ২১০ ধরনের পণ্যে শুল্কমুক্ত সুবিধা দেওয়ার কথা রয়েছে। এর ফলে বাংলাদেশ বর্তমান আমদানি পরিমাণের হিসেবেই প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা বার্ষিক রাজস্ব হারাবে।
-- --
লেখক: ঢাকা পেপার্স-এর যুগ্ম সম্পাদক।
ই-মেইল: [email protected]


